গাইবান্ধায় সার সংকট আতঙ্কে কৃষকের লম্বা লাইন
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সার সংকটের আতঙ্কে কৃষকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে অবৈধ সার মজুতের দায়ে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা, অন্যদিকে কুড়িগ্রামের সার গুদাম লুটের ঘটনার প্রভাবে বামনডাঙ্গায় লম্বা লাইন ও বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে। প্রশাসন ও পুলিশের তৎপরতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মীরগঞ্জ বাজারে সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে অভিযান চালিয়ে কুঞ্জ ট্রেডার্স নামের এক খুচরা সার ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। প্রতিষ্ঠানটির মালিক কৃষ্ণ চন্দ্র দাসকে সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ নিয়ন্ত্রণ আদেশ লঙ্ঘনের দায়ে এই জরিমানা করা হয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঈফফাত জাহান তুলি অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো এই অভিযানে প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে সার মজুতের সত্যতা পাওয়া যায়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, অবৈধ সার মজুত, কালোবাজারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে কৃষকদের জিম্মি করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। কৃষকদের স্বার্থে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে তিনি জানান।
অন্যদিকে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বামনডাঙ্গা ইউনিয়নে গত কয়েকদিন ধরে সারের তীব্র সংকটের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেশী জেলা কুড়িগ্রামে সার গুদাম লুটের ঘটনার রেশ পড়ে এই এলাকায়। আমন মৌসুমের শুরুতেই এই আতঙ্কে ডিলার পয়েন্টগুলোর সামনে শত শত নারী-পুরুষ কৃষক হুমড়ি খেয়ে পড়েন।
সকাল থেকেই সার পাওয়ার অনিশ্চয়তায় কৃষকরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন। ডিলারের কাছে পর্যাপ্ত সার মজুদ থাকলেও সার পাওয়া যাবে না—এই আতঙ্কে একযোগে শত শত কৃষক জড়ো হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ধাক্কাধাক্কি ও হট্টগোলের খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যায় বামনডাঙ্গা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের একটি দল।
পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং নারী-পুরুষের জন্য পৃথক সারির ব্যবস্থা করে সুশৃঙ্খলভাবে সার বিতরণ নিশ্চিত করেন। তাদের দ্রুত হস্তক্ষেপে বড় ধরনের সংঘাত ও অপ্রীতিকর ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়।
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষক রফিকুল ইসলাম (৪৮) বলেন, সকাল ৮টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ পেছন থেকে ধাক্কাধাক্কি শুরু হলে পরিস্থিতি চরম খারাপ হয়ে যায়। তিনি জানান, পুলিশ এসে শক্ত অবস্থান না নিলে রক্তারক্তি হতে পারত। পুলিশের হস্তক্ষেপে শেষ পর্যন্ত শান্তিতে সার পেয়েছেন তিনি।
ভিড়ে হেনস্তার শিকার হওয়া আমেনা বেগম (৫০) নামের এক নারী কৃষক জানান, পুরুষদের অতিরিক্ত ভিড় ও ধাক্কাধাক্কিতে নারীদের সার নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পরে পুলিশ এসে নারীদের জন্য আলাদা লাইনের ব্যবস্থা করায় নিরাপদে সার হাতে পেয়েছেন তিনি।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার কাইয়ুম চৌধুরী জানান, উপজেলায় প্রকৃতপক্ষে সার সংকট নেই। তবে কুড়িগ্রামে সার গোডাউন লুটের ঘটনায় কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তিনি বলেন, কেউ যাতে অবৈধ সার মজুত ও কালোবাজারি করে কৃত্রিম সংকটের সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে সব সময় সচেতন রয়েছেন কর্তৃপক্ষ। তিনি সাংবাদিকসহ সকল সচেতন নাগরিকদের কাছে কোথাও কালোবাজারি বা অবৈধ সার মজুদ হলে তথ্য দিতে সহযোগিতা চেয়েছেন।
বামনডাঙ্গা পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কুড়িগ্রামের ঘটনার পর কোনো মহল যাতে কৃত্রিম সংকট বা আতঙ্ক সৃষ্টি করে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে, সেজন্য পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কৃষকরা যাতে দালালের দৌরাত্ম্য ছাড়া ন্যায্যমূল্যে ও শান্ত পরিবেশে সার সংগ্রহ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ডিলার পয়েন্টগুলোতে পুলিশের নজরদারি অব্যাহত থাকবে।