দুই ছেলেকে বিদেশ পাঠাতে সাড়ে ১৭ লাখ টাকার ঋণ, সুদের চাপে জীবন দিলেন কৃষক
দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে পরিবারের আর্থিক সংকট কাটানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন কৃষক আব্দুস সালাম। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে ঋণ আর সুদের জালে জড়িয়ে শেষ পর্যন্ত নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি। একদিকে এনজিওর কিস্তির চাপ, অন্যদিকে সুদকারবারির টাকার জন্য হুমকি—সব মিলিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন ৬৫ বছর বয়সী এই কৃষক। পরিবারের অভিযোগ, ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য নানা চাপ ও হুমকির একপর্যায়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন তিনি।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার কুশমাইল ইউনিয়নের ধামর মধ্যপাড়া গ্রামের শাহাবুদ্দিনের ছেলে আব্দুস সালাম শনিবার (২২ আগস্ট) দিবাগত রাতে বাড়ির পাশে একটি গাছে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। পরদিন রোববার (২৩ আগস্ট) সকালে পরিবারের সদস্যরা গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় তার মরদেহ দেখতে পান।
নিহতের স্ত্রী নূর জাহান (৬০) অভিযোগ করেন, সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পারলে তার স্বামীকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হতো। এমনকি তার মেয়ের জামাই জাকিরুল ইসলামকেও আটক করে রাখার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘সুদের টাকা না দিলে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে, জামাইকে আটকিয়ে সুদের টাকার জন্য হুমকি দেয় সুদকারবারিরা। এনজিওর লোকজন বাড়িতে এসে কিস্তির টাকা না পেয়ে আত্মহত্যা করার জন্য আমার স্বামীকে বলে যায়।’ এ ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবি করেছেন তিনি।
নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসী জানান, প্রায় ১০ মাস আগে সুদকারবারি লিটনের কাছ থেকে ছয়টি সাদা ব্যাংক চেকের পাতা জমা দিয়ে সাড়ে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন আব্দুস সালাম। দুই ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর উদ্দেশ্যেই তিনি এই টাকা নেন। পরে ছোট ছেলে কাজল মিয়াকে বিদেশে পাঠানোর জন্য শিবগঞ্জ এলাকার সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে সাড়ে সাত লাখ টাকা দেন। কিন্তু বিদেশে পাঠানোর কথা বলে নানা তালবাহানা করে ওই টাকা আত্মসাৎ করেন সাইফুল।
পরে সুদকারবারির টাকা পরিশোধ করতে নিজের বাড়িভিটাও বিক্রি করে দেন কৃষক সালাম। তবে টাকা নেওয়ার সময় দেওয়া ছয়টি সাদা চেকের পাতা সুদকারবারি লিটনের কাছে থেকে যায় বলে পরিবারের দাবি।
এরপর বাড়ির পাশের ইরাকপ্রবাসী ঈমান আলীর মাধ্যমে ছোট ছেলে কাজল মিয়াকে বিদেশে পাঠান আব্দুস সালাম। কাজল বিদেশে যাওয়ার পরও প্রায় ১০ মাস ধরে পরিবারকে কোনো টাকা দিচ্ছিলেন না বলে স্বজনেরা জানান। এ অবস্থায় পরিবারের আর্থিক সংকট আরও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে তারা তিন-চারটি এনজিও থেকে মোট ১৪ লাখ টাকা ঋণ নেন।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, একদিকে আগের ঋণ ও সুদের টাকা, অন্যদিকে এনজিওর কিস্তি—সব মিলিয়ে আব্দুস সালামের ওপর ঋণের বোঝা বাড়তেই থাকে। এর মধ্যেই সুদকারবারি লিটন তার কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করে চাপ দিতে থাকেন বলে অভিযোগ করেন নিহতের স্ত্রী নূর জাহান।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ৮টার দিকে লিটন আব্দুস সালামের বাড়িতে গিয়ে ১০ লাখ টাকা দাবি করেন বলে পরিবারের অভিযোগ। টাকা দিতে না পারলে তার মেয়ের জামাই জাকিরুল ইসলামকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ওই দিনই ফালুর বাজারে মোর্শেদের ঘরে জাকিরুলকে পেয়ে লিটন টাকার জন্য চাপ দেন এবং তাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি জানতে পেরে আব্দুস সালাম আরও ভেঙে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের দাবি, নিজের অসহায়ত্বের কারণে মেয়ের জামাইকে অপমানিত হতে দেখে তিনি মানসিকভাবে খুবই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
এর পরদিন রোববার (২৩ আগস্ট) সকালে বাড়ির কাছেই একটি গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় আব্দুস সালামের মরদেহ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
নিহতের মেয়ে হাজেরা খাতুন বলেন, ‘সুদের টাকা দিতে দিতে আমার বাবা এখন নিঃস্ব হয়ে গেছে। বাড়ি ভিটা বিক্রি করে গাছতলায় ঠাঁই নিয়েছে। সুদের টাকা ছাড়াও তিনটি এনজিও থেকে ১৪ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে সুদের টাকা দিয়েছেন। আরডিএস নামক এক এনজিও থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ উঠিয়ে বাবাকে দেই। যেন আমার বাবা ঋণের চাপ থেকে মুক্ত থাকে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার আরডিএস নামক এনজিওর ম্যানেজারসহ লোকজন বাড়িতে এসে টাকা না দিতে না পারলে আমার বাবাকে মরে যাওয়ার কথা যান। আমার বাবা মরে গেলেই নাকি তারা বেঁচে যান। আমি আমার বাবা যাদের কারণে আত্মহত্যা করেছে তাদের প্রত্যেকের শাস্তি চাই। ঋণের কারণে আর যেন কোন সন্তান বাবা হারা না হন।’
এ বিষয়ে আরডিএস এনজিওর ম্যানেজার সোহেল মিয়ার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
নিহতের স্ত্রী নূর জাহানের দাবি, তার স্বামীকে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেওয়ার পেছনে যারা জড়িত, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, ঋণ ও সুদের চাপের কারণে যেন আর কোনো পরিবার এমন পরিস্থিতির শিকার না হয়।
আব্দুস সালামের মেয়ের জামাই জাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘ঋণের চাপের কারণে তার শ্বশুর আত্মহত্যা করেছেন।’ এ ঘটনায় বিচারের দাবিতে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ফুলবাড়ীয়া থানার ওসি (তদন্ত) মশিউর রহমান জানান, ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করা কৃষক আব্দুস সালামের মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে দাফন করা হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে আত্মহত্যায় প্ররোচনাকারী হিসেবে তিন-চারজন সুদকারবারির নাম মৌখিকভাবে বলা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।