আমার জীবনের শেষ সম্বলটাও শেষ হয়ে গেল, হবু স্ত্রীকে নিয়ে কী বললেন জবি ছাত্র অদিত কর
‘আমার জীবনের শেষ সম্বল টাও শেষ হয়ে গেলো’—গত বুধবার হবু স্ত্রী আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর সঙ্গে একটি ছবি তুলে ক্যাপশনে এমনটাই লিখেছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী অদিত কর। সেটিই ছিল তাদের প্রথম কাপল ছবি। পরদিনই রংপুরে নির্মম হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান প্রার্থীসহ তার বাবা, মা ও ছোট ভাই। বিয়ের তারিখও এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়েছিল অদিত ও প্রার্থীর।
ঘটনার পর অদিত কর স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘আমার জীবনের শেষ সম্বল টাও শেষ হয়ে গেলো। এটা বুধবারের ছবি। খুব করে বললো সেদিন আমরা তো কখনো কাপল পিক তুলি নাই। চলো আজকে তুলি। চিন্তা করো না আগামী, আমি তোমার সাথে ছিলাম, আছি, থাকবো।’
নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অদিত নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জানান, আগামী চক্রবর্তী ও অদিতের বিয়ে চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। দুই পরিবারের মধ্যে বিয়ের প্রস্তুতি নিয়েও কথাবার্তা চলছিল। কিন্তু হঠাৎ এমন ঘটনায় চরম হতবাক ও বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন অদিত।
ওই বন্ধু ফেসবুকে লেখেন, ‘অদিত কর হবু স্ত্রীকে হারিয়ে মানসিকভাবে মারাত্মক বিপর্যস্ত (ট্রমাটাইজড), তাকে কীভাবে সান্ত্বনা দেব বুঝতে পারছি না। কিছুদিন আগেই অদিতের বাবা মারা গেছেন, আর এখন চিরতরে হারিয়ে গেল তার হবু স্ত্রীও।’
এর আগে শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরের কামালকাছনা-মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় রবিবার ভোরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নামে দুজনকে আটক করা হয়। পরে ওই দিন বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন।
এ ঘটনায় রবিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক কারণ ও ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
পুলিশ কমিশনারের তথ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে তার বাড়ির ছাদে প্রবেশ করে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। এ সময় গণপতি চক্রবর্তী ছাদে উঠে তাদের দেখতে পান। মাদক সেবন ও সেখানে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে তিনি তাদের বকাঝকা করেন।
পুলিশের দাবি, গণপতি চক্রবর্তী তাদের মাদক সেবনের বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দিতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় দুই যুবক। একপর্যায়ে সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে ধরলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
আরও পড়ুন: জবি ছাত্রের সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছিল প্রার্থীর, হত্যাকাণ্ডের আগের দিনই পোস্ট করেন প্রথম কাপল ছবি
কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যার সময় তার বাঁচার চেষ্টা ও শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওপরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সিঁড়িতে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তাদের ২৫ বছর বয়সী মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে এলে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। প্রার্থী চক্রবর্তীকে হত্যা করতে চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। একপর্যায়ে আসামিরা রশি দিয়ে তার গলা ও মুখ পেঁচিয়ে ধরে জোরে টান দেয়। এতে তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখ বেরিয়ে আসে। পরে ঘরে থাকা ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকেও হত্যা করে তারা।
পুলিশের দাবি, প্রিয়ম আসামিদের চিনত। ভবিষ্যতে সে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই তাকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ওই বাড়ির ওয়াশরুমে গোসল করে। পরে সেখানে বসেই আবার ইয়াবা সেবন করে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এরপর তারা বাসার আসবাবপত্র তল্লাশি করে স্বর্ণালংকার বের করে। পুলিশের দাবি, সিদ্ধার্থ একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করে। তাই আগুন দিয়ে পরীক্ষা করে কোনটি আসল স্বর্ণ, তা শনাক্ত করে নেয় সে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার জুমার নামাজের সময় আশপাশের লোকজন মসজিদে গেলে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যায়। বের হওয়ার আগে তারা ডাইনিং টেবিলে বসে বয়ামে রাখা খেজুর খায়। এ ছাড়া মাদকের প্রভাব কমানোর জন্য ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খায় বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছিলো না রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারকে। শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যান শ্যালিকা। সেখানে গিয়ে দেখেন বাড়ি তালাবদ্ধ। জানালা দিয়ে দেখেন এলোমেলো ঘর। বেশ কিছুদিন ধরে বাড়িটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ ছিল। শনিবার রাতে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাড়ির তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে। স্থানীয়রা আরও জানান, নিহত গণপতি চক্রবর্তী শিক্ষকতা থেকে অবসর নেয়ার পর নিজ বাসায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন।