৩ মাসে সাতক্ষীরায় ৬৫ জনের আত্মহত্যা, অপমৃত্যু ১৩৬
সাতক্ষীরায় চলতি বছরের মে থেকে জুলাই এই তিন মাসে ৬৮৪টি অপরাধের ঘটনায় মামলা হয়েছে। একই সময়ে জেলায় ১৩৬ জনের অপমৃত্যু এবং ৬৫টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। হত্যা, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ, মাদক, চুরি, সীমান্তে গুলিবর্ষণ এবং সুন্দরবনে জেলে অপহরণের মতো ঘটনায় জেলার সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
শনিবার (২২ আগস্ট) বিকেলে সাতক্ষীরা শহরের ম্যানগ্রোভ সভাকক্ষে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) সহযোগিতায় উত্তরণ-ডিএইচআরএনএস প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত ত্রৈমাসিক সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সভায় মে থেকে জুলাই পর্যন্ত জেলার মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর তৈরি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন এমএসএফের সেক্রেটারিয়েল সাপোর্ট স্টাফ অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ মুনিরুদ্দীন।
সাতক্ষীরা জিআরও অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মে থেকে জুলাই পর্যন্ত জেলার আটটি থানায় ৬৮৪টি অপরাধের মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ডাকাতি ১টি, ডাকাতির প্রস্তুতি ৩টি, দস্যুতা ৩টি, হত্যা ৯টি, দ্রুত বিচার আইনে ৫টি, ধর্ষণ ২১টি, বিভিন্ন ধরনের নারী নির্যাতন ৫০টি, শিশু নির্যাতন ৭টি এবং অপহরণের ঘটনা ৬টি। এ ছাড়া সিঁধেল চুরি ১১টি, গবাদিপশু চুরি ৩টি, গাড়িচুরি ৩টি, অন্যান্য চুরি ১৩টি এবং সড়ক দুর্ঘটনায় ৫টি মামলা হয়েছে।
একই সময়ে পর্নোগ্রাফি আইনে ৪টি, সাইবার নিরাপত্তা আইনে ৫টি, অস্ত্র আইনে ৩টি, চোরাচালান আইনে ১২টি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ২৫১টি, চেতনানাশক-সংক্রান্ত ৪টি এবং অন্যান্য খাতে ৩৪২টি মামলা হয়েছে। এর আগের তিন মাসে জেলায় অপরাধের ঘটনায় ৬৩২টি মামলা হয়েছিল। সে হিসাবে আগের তিন মাসের তুলনায় মে-জুলাই সময়ে মামলার সংখ্যা বেড়েছে ৫২টি।
অপরাধের পাশাপাশি বিচারাধীন মামলার সংখ্যাও বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে নারী, শিশু, মানবপাচার ও পিটিশনসহ বিচারাধীন মামলা ছিল ৪ হাজার ৩২১টি। জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ৩২৭টিতে। জুলাইয়ে আরও ১০টি বেড়ে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৩৭টিতে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে ৪৯ জন, জুনে ৪৪ জন এবং জুলাইয়ে ৪৩ জনসহ তিন মাসে মোট ১৩৬ জনের অপমৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৬৫টি। এর মধ্যে মে মাসে ২৬টি, জুনে ২২টি এবং জুলাইয়ে ১৭টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।
সভায় আঞ্চলিক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরি আরেকটি তথ্য বিবরণীতে তিন মাসে ৬৮ জনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, মে থেকে জুলাই পর্যন্ত ১৫টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মে মাসে ৩টি, জুনে ৫টি এবং জুলাইয়ে ৭টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
ওই তথ্য বিবরণী অনুযায়ী, এ সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় ৬ জন, আত্মহত্যা ও মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় ৯ জন, বজ্রপাত ও ঝড়ে ৮ জন এবং বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ৭ জন মারা গেছেন। পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছেন ৯ জন। এ ছাড়া সাপের কামড়, ভীমরুলের আক্রমণ ও বিদেশে ড্রোন হামলায় ৬ জন, গাছ ও ছাদ থেকে পড়ে ৫ জন, কারাগারে ১ জন, পিলার ও দেয়ালচাপায় ১ জন এবং বমি করে অস্বাভাবিকভাবে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সীমান্ত ও সুন্দরবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতিও সভায় উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুন মাসে সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে দুই বাংলাদেশি আহত হয়েছেন। অন্যদিকে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে মুক্তিপণের দাবিতে ডাকাতদের হাতে ৩২ জন জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন।
এদিকে উত্তরণ-ডিএইচআরএনএস প্রকল্পের আওতায় এ সময়ে পাঁচজনকে লিগ্যাল সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে। চলমান মামলায় ১৭ জনকে আইনি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে এবং চারটি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা হয়েছে।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কারী সোফিয়া হাসিন বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতি মানবাধিকারকর্মীদের কাজকে আরও গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি করে তুলেছে। বিভিন্ন মানবাধিকার তথ্য অনুযায়ী রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, সংখ্যালঘু নির্যাতন, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার এবং নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল, মে ও জুন—এই তিন মাসে মবের মাধ্যমে ১৯৬টি ঘটনায় ৮৬ জন নিহত এবং ২৪৬ জন আহত হয়েছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সোফিয়া হাসিন বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিটি ঘটনা শুধু একটি সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একজন মানুষের জীবন, একটি পরিবারের কষ্ট এবং একটি সমাজের ব্যর্থতা। তাই মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা মনিটরিং, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং, প্রতিবাদ সংগঠিত করা, অভিযুক্তদের শাস্তি নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগীদের সহায়তা এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অ্যাডভোকেসি জোরদার করতে হবে।
সভায় বক্তারা বলেন, সাতক্ষীরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দীর্ঘদিন বিচারক না থাকায় নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত মামলার ফাইলিং ও বিচার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে বহু নারী বিচার ও অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বিষয়ে সভায় সর্বসম্মতিক্রমে আগামী ৩০ আগস্ট সাতক্ষীরা জজ কোর্টের সামনে মানববন্ধন এবং সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন সাতক্ষীরা ডিস্ট্রিক্ট হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার ও মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের মনিটরিং অফিসার সাহিদ মাহফুজ। এ ছাড়া বক্তব্য দেন এইচআরডি নেটওয়ার্কের যুগ্ম আহ্বায়ক মাধব চন্দ্র দত্ত, সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুল হামিদ, অধ্যক্ষ পবিত্র মোহন সরকার, সিনিয়র সাংবাদিক কল্যাণ ব্যানার্জী, জার্নালিস্ট এইচআরডি নেটওয়ার্কের সদস্য সচিব মোস্তাফিজুর রহমান উজ্জ্বলসহ অন্যরা।
সভায় গত তিন মাসে জেলার সাধারণ ও নিরীহ মানুষকে বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতনের মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে এসব ঘটনা প্রতিরোধে মানবাধিকার মনিটরিং, ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং, আইনি সহায়তা এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।