২৩ আগস্ট ২০২৬, ২২:৪৪

খাল থেকে ব্রিজের বীমের লোহা তুলে নিলেন স্বেচ্ছাসেবকদল নেতা, ৪ গ্রামের যাতায়াত বন্ধ

ব্রিজের থেকে খুলে ফেলা বীম এবং অভিযুক্ত সাতুরিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মামুন আকন।  © টিডিসি ছবি

ঝালকাঠির রাজাপুরে কোনো অনুমতি ছাড়াই একটি খালের আয়রন ব্রিজের বীমসহ বিভিন্ন লোহার মালামাল খুলে নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে সাতুরিয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক মামুন আকনের বিরুদ্ধে। কোনো বিকল্প পারাপারের ব্যবস্থা না করে ব্রিজটি খুলে ফেলায় প্রায় চার গ্রামের কয়েকশ মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে।

গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) উপজেলার সাতুরিয়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর তারাবুনিয়া এলাকায় এদবর খালের ওপর থাকা পুরোনো আয়রন ব্রিজের বীমসহ বিভিন্ন মালামাল খুলে নেওয়ার সময় স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়েন মামুন আকন।

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন ধরে খালের ওপর থাকা সেতুটি ব্যবহার করে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করে আসছেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, নারী, বয়স্কসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রতিদিন এই সেতু দিয়ে খাল পারাপার হতেন।

তবে কোনো বিকল্প চলাচলের ব্যবস্থা না করে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ব্রিজের বীম ও অন্যান্য মালামাল খুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে এলে তারা বাধা দেন।

পরে উপজেলা এলজিইডি অফিসের লোকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্রিজের মালামালের তালিকা (সিজার লিস্ট) তৈরি করেন। উদ্ধার করা মালামাল স্থানীয় গ্রাম পুলিশ হেমায়েতের জিম্মায় দেওয়া হয় বলে জানান স্থানীয়রা।

ব্রিজের মালামাল খোলার বিষয়ে মামুন আকন বলেন, ‘সেতুর মালামাল তুলেছি, পরিষদে জমা দেওয়ার জন্য। সাতুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাইনুল হায়দার নিপু ও ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য ফিরোজা খানমের অনুমতি নিয়ে খাল থেকে আয়রন ব্রিজের বীম ও মালামাল তুলেছি।’

মানুষের চলাচলের বিকল্প ব্যবস্থা না করে তিনি ব্রিজের বীম ও মালামাল নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে মামুন আকন বলেন, ‘আমি এলাকায় সামাজিক কাজ করি, তাই।’

তবে সাতুরিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ মাঈনুল হায়দার নিপু মামুন আকনের এমন দাবি অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, ‘আমি কাউকে ওই ব্রিজের বীমসহ মালামাল তুলে নেওয়ার অনুমতি দেইনি। ব্রিজের মালামাল অন্যত্র নিতে হলে পরিষদে রেজুলেশন করতে হবে। মানুষের চলাচলের জন্য নতুন ব্রিজ কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা করে তারপর মালামাল নিতে হবে। তাও ওই এলাকার জনপ্রতিনিধি করবে। এখানে মামুন আকনের কোনো অধিকার নেই মালামাল খুলে নেওয়ার।’

৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য ফিরোজা খানমের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

রাজাপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রতন দেবনাথ বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। এসব কাজ দল সমর্থন করে না। এটা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। অপরাধ প্রমাণিত হলে দল তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

রাজাপুর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী এস এম জিয়াউল হক বলেন, ‘মালামাল ওঠানোর আগে আমাদের অনুমতি নেয়নি। আমরা শুনে লোক পাঠিয়ে সিজার লিস্ট করে দিয়েছি। পরে মাল চৌকিদার ইউনিয়ন পরিষদে এনে রেখেছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

রাজাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রিফাত আরা মৌরি বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। জেনে দেখি। ঘটনা সত্য হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

স্থানীয়রা জানান, সেতুটি দীর্ঘদিনের পুরোনো হওয়ায় এর কিছু অংশের স্লাব ভেঙে গিয়েছিল। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশে সুপারি গাছ ব্যবহার করে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার করতেন তারা। এরপরও সেতুটি ছিল ওই এলাকার মানুষের চলাচলের অন্যতম এবং কার্যত একমাত্র মাধ্যম।

কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না করে সেতুর বীম ও লোহার মালামাল খুলে নেওয়ায় বর্তমানে চার গ্রামের কয়েকশ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। শিক্ষার্থী, নারী ও বয়স্কদের চলাচলেও চরম ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সেতু দিয়ে চলাচল স্বাভাবিক করতে দ্রুত তদন্ত করে সেতুটি পুনঃস্থাপন অথবা বিকল্প পারাপারের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে উপজেলা প্রশাসন, এলজিইডি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জনগুরুত্বপূর্ণ কোনো স্থাপনা অপসারণ বা এর মালামাল সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও অনুমোদন নিশ্চিত করা জরুরি। তাই বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।