ময়মনসিংহে ৭ কোটি টাকার দুই ফুটওভার ব্রিজ, স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশাল উপজেলার দুটি স্থানে প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দুটি ফুটওভার ব্রিজ অনেকটাই থাকে জনশূন্য। বাস্তবে সারা দিনে ২০ জন পথচারীও ব্যবহার করেন না এসব ফুটওভার ব্রিজ। ফলে বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত স্থাপনাগুলো জনগণের প্রত্যাশিত কাজে না আসায় প্রয়োজনীয়তা, স্থান নির্বাচন ও পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২২ সালের দিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক সৌমিত্র শেখরের প্রভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশাল পৌর শহরের নওধার জিরো পয়েন্ট (কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় বাইপাস) এলাকায় একটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করা হয়। শিক্ষার্থীদের মহাসড়ক পারাপারের প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে নির্মাণ করলেও সেখানে এর ব্যবহার অত্যন্ত সীমিত।
এরপর দুর্ঘটনার ঝুঁকি ও স্থানীয় ব্যক্তিদের দাবির কথা উল্লেখ করে ২০২৫ সালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের রায়মনি হাসমতের মোড় এলাকায় নির্মাণ করা হয় আরেকটি ফুটওভার ব্রিজ। বিশেষ করে মহাসড়কের ওই অংশে পথচারীদের চলাচল তুলনামূলক কম হওয়ায় দিনের অধিকাংশ সময় ফুটওভার ব্রিজটি প্রায় ফাঁকা পড়ে থাকে। ময়মনসিংহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ওই দুই ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণে প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
এদিকে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। দক্ষিণ পাশের শিশু শিক্ষার্থী ও বয়স্ক মানুষের মহাসড়কের উত্তর পাশে যেতে হয়। কিন্তু দূরে থাকা ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে ঝুঁকি নিয়েই মহাসড়ক পারাপার হয়ে থাকেন তারা।
সরেজমিন রায়মনি হাসমতের মোড় ও পৌর শহরের নওধার জিরো পয়েন্ট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দুটি ফুটওভার ব্রিজই ব্যবহারে আগ্রহ কম পথচারীদের। অনেকেই ফুটওভার ব্রিজ বাদ দিয়ে সরাসরি মহাসড়ক পারাপার হচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান, সারা দিনে ২০ জন পথচারীও দুটি ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার করেন না। এটি নিত্যদিনের চিত্র।
স্থানীয় লোকজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মহাসড়ক পারাপার হন, সেখানে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ না করে কম জনসমাগম এলাকায় দুটি স্থাপনা নির্মাণের যৌক্তিকতা কী? তাদের মতে, জনসাধারণের প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনা করে ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড কিংবা অন্য কোনো জনবহুল স্থানে নির্মাণ করা হলে অনেক বেশি কার্যকর হতো।
স্থানীয় বাসিন্দা আশরাফ আলী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, বাসস্ট্যান্ড কিংবা যেখানে মানুষের চাপ বেশি, এমন জনসমাগমস্থলের মতো স্থান নির্বাচন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ফজলুল হক নামের স্থানীয় একজন জানান, ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। সীমিত মানুষ চলাচলের জন্য রায়মনি হাসমতের মোড় ও নওধার জিরো পয়েন্টে ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ না করে বাসস্ট্যান্ড এলাকায় নির্মাণ করা হলে জনগণ বেশি উপকৃত হতো।
ত্রিশাল উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাবেক সভাপতি মোখলেছুর রহমান সবুজের জানান, সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জনগণের সর্বোচ্চ ব্যবহার ও সুবিধা নিশ্চিত করা। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণে সঠিক জায়গা, সঠিক পরিকল্পনা এবং মানুষের বাস্তব প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নয়ন প্রকল্প নিতে হবে। তাহলেই সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সত্যিকার অর্থে জনকল্যাণে আসবে।
ময়মনসিংহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার মো. শরীফুল আলম বলেন, ‘নির্মাণকালে আমি এখানে ছিলাম না। তবে আমার ধারণা, অবশ্যই শিক্ষার্থী ও স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবির মুখেই হয়তো সড়ক ও জনপথ বিভাগ ওই দুটি ফুটওভার ব্রিজ নির্মাণ করেছে। এতে আমাদের কোনো দোষ নেই।’