২১ আগস্ট ২০২৬, ১৪:৩৩

কৃষিজমিকে অকৃষি দেখিয়ে প্রত্যয়ন, ময়মনসিংহে কমছে আবাদি জমি

শিল্পায়নের চাপে গত এক দশকে ময়মনসিংহে কমেছে ২০ হাজার ৪১৪ হেক্টর কৃষিজমি।  © টিডিসি ছবি

দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের চাপে গত এক দশকে ময়মনসিংহে কমেছে ২০ হাজার ৪১৪ হেক্টর কৃষিজমি। সবচেয়ে বেশি কৃষিজমি হারিয়েছে শিল্পনগরী ভালুকা। কৃষিজমি কমে যাওয়ায় খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের জীবিকা ও পরিবেশ নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। কৃষি বিভাগের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। 

ভালুকা উপজেলা শহর লাগোয়া ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশের বাঘসাতরা এলাকায় ৬৫ বিঘা জলাশয় বালু ফেলে করা হচ্ছে ভরাট। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এখানে গড়ে তোলা হবে বিশাল কারখানা। যেখানে গত কয়েক বছর আগেও উৎপাদন করা হতো ধান।

সেখানকার স্থানীয় চা দোকানি জামাল উদ্দিন বলেন, জন্ম বেড়ে ওঠা আমার এই এলাকাতেই। এখন যে জায়গাটি বালু ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। সেখানে ১০ বছর আগেও ধান হয়েছে। এরপর করা হয়েছে মাছ চাষ। তবে ধানি জমি কমলেও কারখানা হওয়ায় এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে এটা মানতে হবে।

ইনোফলো বিডি কোম্পানির সিকিউরিটি ইনচার্জ সাদ্দাম হোসেন বলেন, কয়েকদিন হলো ইনচার্জ হিসেবে যোগদান করেছি। এখানে এখন শুধু বালু ভরাট করা হচ্ছে। পরিত্যক্ত জলাশয় ভরাট করতে অনেক বালু লাগছে। পরে এখানে কি কোম্পানি হবে সেটা আমার জানা নেই।  

ভরাডোবায় চলমান রয়েছে নাসির ফুটওয়্যার কোম্পানির কাজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিশাল এলাকা নিয়ে গড়ে ওঠা কোম্পানির জায়গায় এক সময় ধান, পাট, মাছ চাষ এবং গরুর খামার ছিল। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে করা হয়েছে কোম্পানি।

স্থানীয় তাজ উদ্দিন বলেন, ২০০ একর জমির ওপর নাসির ফুটওয়্যার কোম্পানি। আমার এক একর ৭০শতাংশ জমি কোম্পানিকে দিয়েছে স্থানীয় একজনের মাধ্যম হয়ে। কিন্তু এখনো পুরো টাকা পায়নি। বলছে দিবে, কিন্তু কবে পাবো তা বুঝতে পারছি না।

তিনি আরও বলেন, একসময় এই জমিতে ধান, পাট এবং মাছ চাষ করা হতো। পরে কোম্পানি মানুষের কাছ থেকে কিনে নিয়েছে।

রফিকুল ইসলাম নামে স্থানীয় আরেকজন বলেন, কর্মসংস্থান ও লাভের আশায় দালালদের চাপের মুখে কলকারখানায় জমি দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। এতে জেলার একের পর এক কৃষিজমি চলে যাচ্ছে অকৃষি ব্যবহারে। কোম্পানির ময়লা আবর্জনায়ও নষ্ট হচ্ছে ফসল।

ফুলবাড়ীয়া উপজেলায় দেশের বৃহত্তম বদ্ধ জলাভূমি বড়বিলা বিল পাড়ে কৃষি জমি ভরাট করে প্যারাগন নামক একটি কোম্পানী গড়ে তুলা হচ্ছে। এ নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে তীব্র ক্ষোব বিরাজ করলেও স্থানীয় প্রশাসন কোন উদ্যোগ নিচ্ছে না। স্থানীয় সেলিম হোসাইন জানান, ঐতিহ্যবাহী বড়বিলার মাঝখান দিয়ে ৩৩ হাজার ভোল্টেজের বিদ্যুতের লাইন নির্মাণ হওয়ায় স্থানীয়দের বাধার মুখে আপাতত কাজ বন্ধ রয়েছে। বিলের মাঝখান দিয়ে বিদ্যুতের লাইন নির্মাণ করা হলে বিলে আসা শত শত পর্যটকের জীবন হুমকির মুখে পড়বে। 

কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, জেলায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ৩১ হাজার ৮২৩ হেক্টর। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আবাদি জমি কমেছে ৬৪৯ হেক্টর, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১৪১৬ হেক্টর, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১৪২৫ হেক্টর, ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৪৩২ হেক্টর, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১৬৯৮ হেক্টর, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২০২৩ হেক্টর, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৬২৮ হেক্টর, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৫৭১ হেক্টর এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমেছে ৪৫৭২ হেক্টর আবাদি জমি।

ভালুকায় ২০২১ সাল থেকে ২০২৬ এই ছয় বছরে আবাদি জমির পরিমাণ কমেছে ৪ হাজার ৬০৭ হেক্টর। ২০২০ সালে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২৭ হাজার ৮৬৯ হেক্টর।

ভালুকা উপজেলা কৃষি অফিসার নুসরাত জামান বলেন, প্রতিনিয়ত ভালুকায় কলকারখানা হচ্ছে। এতে করে কমছে কৃষি জমি। অনেক সময় চাপে পড়ে কৃষি জমিয়ে অকৃষি দেখিয়ে আমাদের প্রত্যয়ন দিতে হচ্ছে।

ময়মনসিংহ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. এনামুল হক বলেন, জেলার কোন জমিকেই অকৃষি জমি বলা যাবে না। এসব জমিকে কোনো না কোনো ফসল কিংবা মাছ চাষ হয়ে থাকে। জমি রক্ষায় আইনও মানা হচ্ছে না। চাপে পড়ে অনেক সময় কৃষিজমিকে অকৃষি দেখিয়ে প্রত্যয়ন দিতে হচ্ছে। যার কারণে প্রতিনিয়ত কমছে কৃষিজমির পরিমাণ।

একের পর এক শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় কৃষিজমি কমার পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে সরকারকে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ভালুকা শাখার সদস্য সচিব কামরুল হাসান পাঠান কামাল বলেন, ভালুকায় ছোট বড় মিলিয়ে ১৪৫টি কলকারখানা রয়েছে। বিগত ২০ বছর ধরে কৃষিজমিকে অকৃষি দেখিয়ে কর্মযজ্ঞ বেশি হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, জেলার ১৩ উপজেলার মধ্যে ভালুকার পাশাপাশি শিল্পকারখানা ত্রিশাল, ফুলবাড়ীয়া এবং সদর উপজেলায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিকল্পনাহীন শিল্পায়ন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কৃষিজমির সংকট আরও তীব্র হবে। তাই সরকারকে এখনি তৎপর হতে হবে।