উথলী-জাফরগঞ্জ সড়ক যেন মরণফাঁদ, প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা
মানিকগঞ্জের শিবালয়ে খানাখন্দে ভরা প্রায় ৯ কিলোমিটার উথলী-জাফরগঞ্জ বেহাল সড়কটি যেন এখন মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা। সিএনজি, হ্যালোবইক ও অটোরিকশা উল্টে ভাঙছে মানুষের হাত-পা। বর্তমানে জনবহুল এ সড়ক দিয়ে অনেক ঝুকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। এ সড়কটি অতিদ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিন দেখা যায়, মানিকগঞ্জের শিবালয় উপজেলার উথলী বাজার থেকে জাফরগঞ্জ বাজার পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটার সড়কটি স্থানীয় সরকার বিভাগ (এলজিইডির) অধীন রয়েছে। এ সড়ক দিয়ে স্থানীয়দের পাশাপাশি জেলার শিবালয়, ঘিওর ও দৌলতপুর এই তিন উপজেলার লোকজন চলাচল করে থাকেন। এ ছাড়া স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, কৃষিপণ্য সরবরাহের পাশাপাশি তিন উপজেলার মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রমের জন্য রাস্তাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই রাস্তাটির বর্তমান অবস্থা একেবারেই নাজুক। বৃষ্টি নামলেই উথলী বাজার ও বাড়াদিয়া বাজারের কাছে সড়কের মাঝে হাঁটুপানি জমে যায়। দেখে মনে হবে এটা কোনো পানিপ্রবাহের খাল। ১০ কিলোমিটার এ সড়কের পুরো অংশের মাঝে মাঝে বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টি নামলে যা জলাশয়ের সৃষ্টি হয়। পানি শুকিয়ে গেলে আবার কাদামাটির সৃষ্টি হয়। পরে মানুষজন চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। রিকশা-অটো উল্টে পড়ে গিয়ে যাত্রীদের হাত-পা ভাঙছে।
এ ছাড়া গর্তের মধ্যে আটকা পড়ে বিভিন্ন যানবাহন নষ্ট হচ্ছে। অবস্থা এমন যে হেঁটে চলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। রিকশা-ভ্যানসহ যানচালকদের আয়ের একটি বড় অংশ খরচ হচ্ছে তাদের গাড়ি মেরামতের কাজে। সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সড়কটিতে কাজ হয়েছিল। অর্থাৎ গত এক দশকে রাস্তাটিতে উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মেরামত কাজের টেন্ডার হলেও ঠিকাদার রাস্তার কিছু অংশ খোঁড়াখুঁড়ি করে রেখে পালিয়ে গেছে। এমতাবস্থায় আরও বেশি অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছে।
বিষয়টি নজরে আসার কথা উল্লেখ করে উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ বলছে,উন্নয়ন পরিকল্পনায় সড়কটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মেরামতের জন্য টেন্ডারও দেয়া হয়েছে। খুব শিগগির ঠিকাদারকে হাজির করে রাস্তাটির মেরামত কাজ শুরু করা হবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আজাহার হোসেন বলেন, উথলী-জাফরগঞ্জ রাস্তাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে রাস্তাটি এ বেহাল দশা অবস্থায় পড়ে আছে। রাস্তার মাঝে মাঝে বড় গর্তের। সৃষ্টি হয়েছে। এ রাস্তা দিয়ে এখন চলাচল করা খুবই কঠিন। বৃষ্টি নামলে বাড়াদিয়া বাজারের কাছে হাঁটুপানি জমে। রিকশা-ভ্যান উল্টে গিয়ে মানুষের পা পর্যন্ত ভাঙছে। এগুলো দেখার কেউ নেই।
স্থানীয় এক কলেজছাত্রী নুসরাত জাহান বলেন, ‘২০ মিনিটের রাস্তা যেতে দ্বিগুণের বেশি সময় লাগে। আর বৃষ্টির দিনে তো হাঁটাও যায় না। সিএনজিচালিত অটোরিকশা আর ইজিবাইক মাঝেমধ্যেই বিকল হয়ে যায়। এতে গন্তব্যে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়। জরুরি ভিত্তিতে রাস্তাটি মেরামত করা দরকার।
স্থানীয় কৃষক আফজাল বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে বাজারে কৃষিপণ্য নিয়ে যাই। কিন্তু সময়মতো পৌঁছাতে পারি না। গাড়ি ভাড়াও বেশি। লাভের একটা অংশ রাস্তাতেই চলে যায়।’
একই অভিযোগ তোলেন ওই এলাকার একাধিক ব্যবসায়ীরা। তারা জানান, রাস্তায় যানবাহন না চলায় পণ্য পরিবহন করতে সময় ও খরচ দুটোই বাড়ছে। এতে স্থানীয় বাজারগুলোতে সরবরাহ সংকট দেখা দেয়। যার প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের দামে।
উথলী বাজারের ব্যবসায়ী বিপ্লব ঘোষ বলেন, ‘আমার দোকানের সামনেই অনেক বড় গর্ত হয়ে আছে। বৃষ্টি হলেই পানি জমে যায়। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটছে এখানে। দীর্ঘসময় ধরে এই সড়কের এমন বেহাল অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় সকলকেই অনেক কষ্ট করে চলাচল করতে হচ্ছে। দীর্ঘ দিন ধরেই এ রাস্তাটি মেরামতের জন্য বলা হলেও কিন্তু এ সমস্যার কোন সমাধান হচ্ছে না।’
স্থানীয় দোকানদার খলিলুর রহমান বলেন, ‘রাস্তাঘাট ভালো না থাকলে ব্যবসা হয় না। মালামাল ঠিকমতো আসে না, আবার ক্রেতাও কমে গেছে। আমাদের সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়তে হচ্ছে। সরকারের কাছে আবেদন, দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা হোক।’
সিএনজিচালক জাহিদ বলেন, ‘মৃত্যুকে সঙ্গে নিয়ে এই সড়ক দিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে আমরা রিক্সা চালাই। একটু এদিক-সেদিক হলেই গাড়ি উল্টে যায়। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে মোটর জ্বলে যায়। কখনো চাকা গর্তে পড়ে, কখনো ব্রেক নষ্ট হয়। মেরামত করতেই আয়ের টাকা শেষ হয়ে যায়।’
ভ্যানচালক রহমান বলেন, ‘রাস্তার কারণে ভ্যান মেরামত করতে করতেই আমাদের জীবন শেষ। আবার সংসার চালাবো কি করে। একদিন গাড়ি চালালে দু’দিন বসে থাকতে হয়। রাস্তার কারণে গাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। যে টাকা কামাই করি সে টাকা দিয়ে গাড়ি সাড়তে হচ্ছে। এভাবেই চলছে আমাদের দিন কাল। আমাদের এগুলো দেখার মতো কেউ নেই। খুব কষ্টে আছি আমরা।’
বাড়াদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রকাশ চন্দ্র মালো বলেন, ‘উথুলী-জাফরগঞ্জ সড়কটি অত্যান্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ রাস্তা দিয়ে মাগুরাইর, জগনাথদিয়া ও আশপাশের কোমলমতি শিশুরা এ রাস্তা দিয়ে স্কুলে আসা-যাওয়া করে থাকে। এসময় কাঁদা ছিটে তাদের জামা-কাপর নষ্ট হয়ে যায়। আপনারা একটু লেখেন যেম রাস্তাটি ঠিক হয়।’
উপজেলা প্রকৌশলী মো.আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ কিলোমিটার রাস্তার মেরামতের কাজের দরপত্র আহবান করা হয়। একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিছু কাজ করেছে। বৃষ্টির জন্য একটু সমস্যা হচ্ছে। বৃষ্টিপাত কমলে ঠিকাদার দ্রুতই মেরামত কাজ শুরু করবেন বলে তিনি জানান।