কৃষকের কষ্টার্জিত ২ লাখ টাকা কেটে নষ্ট করল ইঁদুর-উইপোকা
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় এক কৃষকের দীর্ঘ দিনের কষ্টার্জিত প্রায় দুই লাখ টাকা ইঁদুর ও উইপোকার আক্রমণে পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। স্ত্রী-সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে জমানো এই টাকা কাঠের আলমারিতে রেখেছিলেন কৃষক তোফাজ্জল হোসেন ভাটিয়া, যার বয়স ৭২ বছর। কিন্তু অসাবধানতার কারণে সেই স্বপ্ন এখন ছারখার হয়ে গেছে।
শুক্রবার (৭ আগস্ট) বিকালে আলমারি খুলে এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননি বৃদ্ধ কৃষক। শনিবার (৮ আগস্ট) বিকালে খবর পেয়ে তার বাড়িতে ভিড় করেন স্থানীয়রা। আলমারি থেকে বের করা হয়েছে কাটা ছেঁড়া ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট, যার অধিকাংশই আর ব্যবহারের উপযোগী নয়।
তোফাজ্জল হোসেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার দহবন্দ ইউনিয়নের উত্তর ধুমাইটারি গ্রামের বাসিন্দা। ঢাকায় রিকশা চালিয়ে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন তিনি। পরে গ্রামে ফিরে দীর্ঘ ১০ থেকে ১২ বছর ধরে জমি চাষ করে সংসার চালাচ্ছেন। একটু একটু করে জমানো সেই টাকাগুলো ছিল তার তিন মেয়ের বিয়ে ও সংসারের জরুরি প্রয়োজনের জন্য।
তোফাজ্জল হোসেন জানান, তিনি তিন মেয়ে ও সহধর্মিণীর ভবিষ্যৎ চিন্তা করে এই টাকা জমাচ্ছিলেন। টাকাগুলো ছিল জমিন বন্ধকের। কিন্তু তিনি কখনো ভাবতে পারেননি এরকম ঘটনা ঘটবে। তার এই অর্থ শুধু টাকা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা ও অনেক দিনের পরিশ্রম। উইপোকা তার স্বপ্ন কেটে নষ্ট করেছে বলে মনে করছেন তিনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন যে সারাজীবন রোদে পুড়ে মাঠে কাজ করেছেন, একটা টাকাও অযথা খরচ করেননি। তিনি ভাবছিলেন মেয়েটার বিয়ে দেবেন, কিন্তু এখন তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে।
ঘটনার পর এলাকাবাসী ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছেন। স্থানীয় বাসিন্দা খলিল মনে করেন, বাড়িতে নগদ টাকা রেখে থাকলে সতর্ক থাকা উচিত। পুরোনো কাঠের আলমারিতে টাকা রাখাটাই ছিল দুর্ঘটনার মূল কারণ। বর্তমান সময়ে টাকার যে দাম আর অর্থনৈতিক সংকট, সেখানে এভাবে টাকা নষ্ট হওয়া সত্যিই হৃদয়বিদারক বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
দহবন্দ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. ছোবেদ আলী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তোফাজ্জলের তেমন জায়গা-জমিন নেই। তিনি চর থেকে উঠে এসে এখানে সংসার শুরু করেছিলেন। শুক্রবার বিকেলে নতুন করে আলমারিতে টাকা রাখতে গিয়েই এই মর্মান্তিক চিত্র দেখতে পান তিনি। ইউপি সদস্য আরও জানান, তারা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে কোনো সহযোগিতা দেওয়া যায় কি না, তা দেখার চেষ্টা করবেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গ্রামের অনেকেই ব্যাংকের প্রতি আস্থাশীল নন। দূরবর্তী শাখা, জটিল প্রক্রিয়া কিংবা বাড়তি খরচের কারণে তারা নগদ টাকা বাড়িতেই সংরক্ষণ করেন। কিন্তু বর্ষাকালে আর্দ্রতার কারণে কাঠের আলমারি-ট্রাংকে উইপোকার উপদ্রব বেড়ে যায়, যা অনেক সময় চোখের আড়ালে থেকেও বড় ক্ষতি করে ফেলে।
ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, অল্প টাকা হলেও সঞ্চয়ী হিসাব খুলে ব্যাংকে রাখা সবচেয়ে নিরাপদ। বাড়িতে নগদ টাকা রাখার প্রয়োজন হলে তা শুকনো ও সিল করা ধাতব বা প্লাস্টিকের বাক্সে সংরক্ষণ করতে হবে এবং নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। উইপোকা রোধে কাঠের আসবাবপত্রে নিয়মিত কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক তোফাজ্জল হোসেন সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেছে, নষ্ট হওয়া টাকাগুলোর বদলে যেন তাকে নতুন টাকা দেওয়া হয়। তা না হলে তিনি একদম নিঃস্ব হয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।