০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৭:৫৮

বছর ঘুরতেই অচল ৫৬ ইউনিয়নের কোটি টাকার আবহাওয়া যন্ত্র, সুফল পাননি কৃষক

জামালপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, ইনসেটে নষ্ট ডিসপ্লে বোর্ড  © টিডিসি সম্পাদিত ছবি

কৃষকদের আগাম আবহাওয়ার তথ্য দিয়ে ফসলের ক্ষতি কমানোর লক্ষ্য নিয়ে জামালপুর জেলার ৫৬টি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে স্থাপন করা হয়েছিল আবহাওয়া পূর্বাভাস বোর্ড ও স্বয়ংক্রিয় বৃষ্টি পরিমাপক (অটোমেটিক রেইন গেজ) যন্ত্র। কিন্তু কোটি টাকার সেই উদ্যোগের সুফল পাননি কৃষকরা। কোথাও যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে পড়ে আছে, কোথাও ডিসপ্লে বোর্ড চুরি হয়ে গেছে, আবার কোথাও স্থাপনের পর একদিনের জন্যও চালু হয়নি। ফলে যাদের জন্য এই আয়োজন, সেই কৃষকরাই জানেন না এমন কোনো সেবার অস্তিত্ব ছিল।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিবছরই বন্যা, অতিবৃষ্টি, নদীভাঙন ও খরার মতো দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হন জামালপুরের কৃষকরা। এসব দুর্যোগের আগাম তথ্য কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উদ্দেশ্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে জেলার ৫৬টি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে স্থাপন করা হয় অটোমেটিক রেইন গেজ ও আবহাওয়া ডিসপ্লে বোর্ড। 

পরিকল্পনা ছিল, এসব বোর্ডের মাধ্যমে কৃষকরা অন্তত তিন দিন আগের ও পরবর্তী তিন দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানতে পারবেন এবং সেই অনুযায়ী কৃষিকাজ পরিচালনা করবেন।

কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইউনিয়ন পরিষদে যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হলেও অধিকাংশ স্থানে সেগুলোর কার্যকারিতা নেই। অনেক যন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে আছে বছরের পর বছর। কোথাও আবার ডিসপ্লে বোর্ডই উধাও। ফলে কৃষকদের কাছে পৌঁছায়নি কোনো তথ্য, আসেনি কাঙ্ক্ষিত সুবিধাও।

মেলান্দহ উপজেলার নয়ানগর ইউনিয়নের কৃষক শাহাদাৎ হোসেন দুই বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। ভালো ফলনের স্বপ্ন দেখলেও টানা বৃষ্টিতে তার জমি তলিয়ে যায়। অনেক কষ্টে ফসল রক্ষার চেষ্টা করেও ক্ষতি এড়াতে পারেননি।

শাহাদাৎ হোসেন বলেন, ‘আমরা আবহাওয়ার খবর টেলিভিশন বা মোবাইল ফোনে যা পাই তাই জানি। ইউনিয়ন পরিষদে কোনো আবহাওয়া বোর্ড আছে বা কৃষকদের জন্য কোনো তথ্য দেওয়া হয়, এমন কিছু কখনও শুনিনি।’

শুধু শাহাদাৎ হোসেন নন, জেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে একই চিত্র পাওয়া গেছে। অধিকাংশ কৃষকই জানেন না তাদের ইউনিয়নে আবহাওয়া তথ্য প্রদর্শনের কোনো ব্যবস্থা রয়েছে। কেউ কেউ জীবনে একবারও বোর্ডে কোনো তথ্য প্রদর্শিত হতে দেখেননি।

ইসলামপুর উপজেলার কৃষক সামিউল ইসলাম বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদে আবহাওয়া পূর্বাভাস বোর্ড আছে, সেটাই আজ আপনাদের মাধ্যমে জানতে পারলাম। এতদিন কেউ আমাদের কিছু জানায়নি। কৃষকদের জন্য এত বড় উদ্যোগ নেওয়া হলেও আমরা তার কোনো সুবিধা পাইনি। যদি আগে থেকে আবহাওয়ার তথ্য পেতাম, তাহলে অনেক সময় ফসলের ক্ষতি কমানো সম্ভব হতো।’

কৃষক মন্টু মিয়া বলেন, ‘এত বছর ধইরা চাষাবাদ করি, কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদে আবহাওয়ার খবর দেয় এমন কোনো বোর্ড আছে তা জানতাম না। যদি আগে খবর পাইতাম, তাহলে হয়তো কিছু ফসল বাঁচাইতে পারতাম। এখন তো আল্লাহর ভরসায় চাষ করি, ক্ষতি হইলে মাথায় হাত দিয়া বসা ছাড়া উপায় নাই।’

সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে দেখা যায়, কোথাও আবহাওয়া বোর্ড অচল অবস্থায় ঝুলছে, কোথাও বৃষ্টি পরিমাপক যন্ত্র বিকল হয়ে পড়ে আছে। কোনো কোনো ইউনিয়নে ডিসপ্লে বোর্ডের যন্ত্রাংশই খুঁজে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, স্থাপনের পর রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির অভাবে পুরো প্রকল্পই কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত আবহাওয়া বোর্ডের মাধ্যমে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, তাপমাত্রা, বাতাসের গতি, আর্দ্রতা, আলোক ঘণ্টা, ঝড় ও দুর্যোগের পূর্বাভাসসহ প্রায় ১০ ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও প্রদর্শনের ব্যবস্থা ছিল। এসব তথ্য কৃষকদের বীজ বপন, সেচ, সার প্রয়োগ ও ফসল কাটার সময় নির্ধারণে সহায়ক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই সুবিধার কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি।

কৃষি বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষকদের জন্য আধুনিক আবহাওয়া তথ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু যন্ত্রপাতি স্থাপনের পর সেগুলো সচল রাখা, তথ্য হালনাগাদ করা এবং কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা তৈরির কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কার্যালয়ের সামনেও স্থাপিত ডিজিটাল আবহাওয়া ডিসপ্লে বোর্ড বছরের অধিকাংশ সময় বন্ধ অবস্থায় দেখা যায়। জেলা পর্যায়ের এমন পরিস্থিতি প্রকল্পটির সামগ্রিক কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

কৃষিবিদ মো. শফিকুর রহমান শিবলী বলেন, ‘মাঠপর্যায়ের প্রয়োজন ও বাস্তবতা যাচাই না করে কোনো প্রকল্প নিলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। কৃষকদের কাছে তথ্য পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত না করায় এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে।’

জামালপুর সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পের জবাবদিহি থাকতে হবে। প্রকল্পটি বাস্তবে কতটুকু কাজে লাগছে, মানুষ উপকৃত হচ্ছে কি না সেটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই তদারকির অভাব স্পষ্ট।’

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ২০২২-২৩ অর্থবছরে জেলার ৫৬টি ইউনিয়নে এসব আবহাওয়া যন্ত্রপাতি স্থাপন করে। তবে প্রতিটি ইউনিট স্থাপনে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সে বিষয়ে স্থানীয় পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে কৃষি আবহাওয়া তথ্যসেবা কৃষকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো সঠিক তথ্য পেলে অনেক ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব, তদারকির ঘাটতি এবং রক্ষণাবেক্ষণের সংকটে জামালপুরে সেই সম্ভাবনাময় উদ্যোগটি আজ ব্যর্থতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও উপকার পাননি কৃষকরা এটাই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

এ বিষয়ে জামালপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘কৃষকদের জন্য আগাম আবহাওয়ার তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন ইউনিয়নে যন্ত্রপাতি অকার্যকর হয়ে থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ বলেন, ‘প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে নতুন করে সংস্কার বা পরিচালনার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। ফলে অনেক স্থানে যন্ত্রপাতি অচল অবস্থায় রয়েছে।’