০৩ আগস্ট ২০২৬, ১৬:২৭

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নিয়োগে প্রশ্নফাঁস-প্রক্সিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ 

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের লগো  © সংগৃহীত

‌‘পরীক্ষার আগের রাতেই প্রশ্ন ফাঁস, হলে উত্তর লেখা হয়েছিল মোবাইল দেখে, একজনের হয়ে প্রক্সি পরীক্ষা দিচ্ছিলেন অন্যজন’- এমন সব গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ নিয়েই সম্পন্ন হয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ১০৫ কর্মচারীর ‌‌'বিতর্কিত' নিয়োগ প্রক্রিয়া। ২৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ মাথায় নিয়ে এবং বোর্ড ও হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এই নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে উঠেছে নানা বিতর্কিত প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে এই নিয়োগের পেছনে কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন খোদ তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সচিব। 

এদিকে, জালিয়াতি ও দুর্নীতির স্পষ্ট প্রমাণাদিসহ গত ৩০ এপ্রিল সিডিএ কর্মচারী ইউনিয়নের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। তবে অভিযোগ দায়েরের তিন মাস পেরিয়ে গেলেও ঝুলে রয়েছে তদন্ত। এখনো কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৩ জুলাই অনুষ্ঠিত সিডিএ’র ৪৬৫তম বোর্ড সভার ১১ নম্বর এজেন্ডায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল—আদালতে বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংস্থাটিতে কোনো ধরনের নতুন নিয়োগ দেওয়া যাবে না। তবে সেই বোর্ড সিদ্ধান্ত এবং হাইকোর্টের বিচারাধীন বিষয়কে তোয়াক্কা না করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে হঠাৎ ১০৫ জনকে নিয়োগ দেয় সিডিএ কর্তৃপক্ষ। যা সরকারি কর্মচারী নিয়োগের আইন, পরিপত্র ও বিধিমালা পরিপন্থি।

বিগত অর্থবছরের সিডিএ বাজেটে নিয়োগ খাতের বিপরীতে কোনো অর্থ বরাদ্দ ছিল না। ব্যাংক থেকে চাকরিপ্রার্থীদের আবেদনের পে-অর্ডারের টাকা সময়মতো সরকারি কোশাগারে জমা না করে ভুয়া বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।

নিয়োগ পরীক্ষায় ছিল নজিরবিহীন জালিয়াতির অভিযোগ। অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষার আগের রাতে সিডিএ’র তৎকালীন সচিব রবীন্দ্র চাকমার পিয়নের ছেলে প্রকাশ্যে প্রশ্নপত্র বিক্রির সময় স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে আটক হয়। তবে তাকে পুলিশে না দিয়ে বিষয়টিকে আড়াল করেন সিডিএ কর্মকর্তারা। তাছাড়া পরীক্ষার হলে মোবাইলের স্ক্রিন দেখে উত্তর লেখা দুই পরীক্ষার্থীকে নিয়ম ভেঙে ভাইভায় ডাকা হয় এবং পরবর্তীতে ওই পদসহ মোট চারজনকে চূড়ান্ত নিয়োগ দেওয়া হয়। 

অন্য একটি ক্যাটাগরিতে ১১ জনকে ভাইভায় ডেকে ১১ জনকেই চাকরি দেওয়া হয়। এছাড়া লিখিত পরীক্ষায় একজনের খাতা অন্যকে দিয়ে লেখানো (প্রক্সি), বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সনদ না থাকা সত্ত্বেও ইমারত পরিদর্শক পদে নিয়োগ প্রদান এবং পরীক্ষার ফলাফলেও কারচুপির প্রমাণ মেলে অভিযোগপত্রে।

সিডিএ সূত্র জানিয়েছে, সংস্থাটিতে বর্তমানে ২৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণের বোঝা রয়েছে। এর মধ্যেই তৎকালীন চেয়ারম্যান সৈয়দ নুরুল কবির ও সচিব রবীন্দ্র চাকমা যোগসাজশ করে তড়িঘড়ি এই নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করেন। 

এ বিষয়ে সিডিএ কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বলেন, উচ্চ আদালতের রায় ও বোর্ড সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে তৎকালীন চেয়ারম্যান ও সচিব কোটি কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য করেছেন। পরীক্ষা থেকে শুরু করে নিয়োগপত্র প্রদান—সবখানেই স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘প্রমাণাদিসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও দুদকে অভিযোগ দেওয়ার তিন মাস পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’ 

এদিকে নিয়োগ জালিয়াতির টানাপোড়েনে বেতন পাচ্ছেন না নবনিয়োগপ্রাপ্ত কর্মচারীদের একটি অংশ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভুক্তভোগী এক ইমারত পরিদর্শক বলেন, ‘আমরা পরীক্ষার আগেই প্রয়োজনীয় সব সনদ জমা দিয়েছি। কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করেই আমাদের নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু এখন কোনো বেতন দেওয়া হচ্ছে না। পরিবার নিয়ে আমরা চরম মানবেতর জীবনযাপন করছি। কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি, দ্রুত আমাদের বকেয়া বেতন-বোনাস পরিশোধ করা হোক।’

তবে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সচিব মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়নি দাবি করে বলেন, ‘বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার পর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় আমাদের কাছে তথ্য চেয়েছিল, আমরা সব মূল কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। মন্ত্রণালয় প্রয়োজন মনে করলে তদন্ত করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‌'সনদ জটিলতার কারণে ইমারত পরিদর্শকদের বেতন হচ্ছে না জানিয়ে বলেন, ‘ফাইলটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, অনুমোদন হয়ে এলেই তারা বেতন-বোনাস পেয়ে যাবেন।’