মেঘনার চরে প্রতি রাতেই হচ্ছে গরু-মহিষ চুরি, দিশেহারা খামারিরা
লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীর চরাঞ্চলে গরু-মহিষ চুরি ও ডাকাতির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় চরম আতঙ্কে রয়েছেন খামারিরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, লক্ষ্মীপুর ও ভোলার চরাঞ্চলকে কেন্দ্র করে সক্রিয় একটি চক্র চুরি হওয়া গরু-মহিষ এক জেলা থেকে অন্য জেলায় সরিয়ে নিচ্ছে। বাধা দিতে গেলে হামলারও শিকার হচ্ছেন বাথান মালিক ও শ্রমিকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মেঘনার চর মেঘা ও রামমোহন চরে দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি প্রভাবশালী পরিবারের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন হলেও তাদের প্রভাব কমেনি। এ কারণে চুরি-ডাকাতির সঙ্গে জড়িত সিন্ডিকেটও সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুক্রবার (১ আগস্ট) রাতে ভোলা থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের পাঁচটি মহিষ লক্ষ্মীপুরের চরাঞ্চলে এনে রাখা হয়। পরে সেগুলো স্থানীয় এক ব্যক্তির মহিষের পালের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।
এদিকে বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে একই চরের কয়েকটি মহিষের বাথানে চোরের দল হামলার ঘটনা ঘটায়। এতে শাহজাহান, জুয়েল, জহির, নবী, নিজাম, কাদির ও রুবেল নামে কয়েকজন আহত হন। তারা লক্ষ্মীপুর, ভোলা ও নোয়াখালীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। পরে তাদের উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর ও ভোলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঘটনার সময় মহিষসহ নগদ টাকা ও মোবাইল নিয়ে যায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত চোরের দল।
অন্যদিকে মেঘনার চরে লক্ষ্মীপুরের পাশাপাশি ভোলা ও বরিশালের অংশও রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকা হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনার অবস্থান নিয়ে টানাপোড়ন দেখিয়ে আসছেন। লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর হাট এলাকায় কোস্ট গার্ড কার্যালয় থাকলেও খবর পেয়েও তারা কোনো অভিযানে যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি, ‘কোস্টগার্ডকে জানালে তারা বলে ভোলায় তাদের মূল কার্যালয়, সেখান থেকে নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত তারা অভিযানে যাবে না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাথান মালিক বলেন, প্রায় প্রতি রাতেই কোনো না কোনো বাথানে চোরের হানা হচ্ছে। এতে লাখ লাখ টাকার গরু-মহিষ হারিয়ে অনেক খামারি নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। চোরদের ধরতে গেলে পরে সংঘবদ্ধভাবে হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কাও থাকে বলে জানান তারা।
সম্প্রতি চররমনী মোহন ইউনিয়নের বাসিন্দা তোফায়েল আহম্মদের মহিষের বাথান থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা মূল্যের ৫টি মহিষ চুরি হয়। গত এক মাস আগে মেঘার চরের মতিন বেপারির ৬টি মহিষ চুরি হয়। সেগুলোর দামও প্রায় ১০ লাখ টাকা। এছাড়া একই চর থেকে কৃষক শাহীনের একটি ও মজিব উল্যার একটি মহিষ চুরি হয়। ওই চর থেকে মহিষের পাশাপাশি গরু চুরিও এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লক্ষ্মীপুর সদরের চররমনী মোহন ইউনিয়ন সৈনিক লীগের সভাপতি গিয়াস উদ্দিন বলেন, আমাদের মহিষের বাতান রয়েছে। প্রায় ১৫ দিন আগে আমাদের মহিষ চুরি হয়েছে। আমরা কোনো চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
চররমনী মোহন ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আবুল বাশার বলেন, গত রাতে ৫টি চোরাই মহিষ সালাহ উদ্দিনের ঘরের পাশে কে বা কারা রেখে গেছে শুনেছি। পরে ওই মহিষগুলো সালাহ উদ্দিনরা তাদের মহিষের পালের সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। আমার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ দিয়ে থাকলে, তা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা।
অভিযোগ রয়েছে, চররমনী মোহান ইউনিয়ন কৃষকদলের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন ও তার ভাইসহ চোরাই গরু-মহিষ ক্রয়-বিক্রয়ে জড়িত। এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে সাদ্দাম হোসেনকে কল দিলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত রাসেল খাঁ সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে। চুরি বা হামলার ঘটনায় আমি অথবা আমার সহযোগীদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
গরু-মহিষ চুরির ঘটনায় মোবাইলে বক্তব্য জানতে চাইলে নিজের নাম বলতে রাজি হননি লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীর হাট কোস্টগার্ড কার্যালয়ের কন্টিজেন্ট কমান্ডারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তবে তিনি জানান, গরু-মহিষ চুরির ঘটনা তারা জানা নেই। ঘটনাটি নজরে আসেনি। নজরে আসলে অভিযান পরিচালনা করা হবে।
লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমী বলেন, মহিষ চুরির ঘটনায় কেউ যদি লিখিত অভিযোগ দেয়, তাহলে আমরা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেবো। গত সপ্তাহেও এক চোরকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া জমির বিরোধেও একজন আরেকজনের গরু-মহিষ নিয়ে যায়। এর পরও ঘটনাগুলো নিয়ে ভোলা ও বরিশাল পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে।
ভোলা জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শহিদুল্লাহ কাওছার সাংবাদিকদের বলেন, চরে ভোলার অংশে হামলার বিষয়টি আমাদের জানা নেই। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।