০২ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৫৯

কীর্তনখোলার পাড়ে সূর্যাস্ত, ক্রিকেট আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস

কীর্তনখোলা নদীর অপরূপ সৌন্দর্য   © টিডিসি ফটো

সূর্য যখন দিনের শেষ আলোটুকু বিলিয়ে দিতে দিতে ধীরে ধীরে দিগন্তের ওপারে হারিয়ে যায়, তখন কীর্তনখোলা নদীর বুকজুড়ে নেমে আসে এক অপার্থিব সৌন্দর্য। নদীর শান্ত জলে লাল, কমলা আর ধূসর রঙের মায়াবী প্রতিফলন যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক জীবন্ত ক্যানভাস। বাতাসে নদীর শীতল পরশ, দূরে গাছের সারি আর আকাশজুড়ে রঙের খেলা—সব মিলিয়ে সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে কীর্তনখোলা যেন হয়ে ওঠে এক অনন্য শিল্পকর্ম।

এই মনোমুগ্ধকর প্রকৃতির মাঝেই অন্য এক দৃশ্য প্রাণ পায়। বরিশাল শহরের কোলঘেঁষা নদীর তীরে একদল তরুণ মেতে ওঠে ক্রিকেটের উচ্ছ্বাসে। নদীর পাড়ের সবুজ ঘাসে অস্থায়ী উইকেট গেড়ে শুরু হয় তাদের খেলা। কেউ ব্যাট হাতে রান তুলতে ব্যস্ত, কেউ বল হাতে উইকেটের খোঁজে, আবার কেউ ছুটে বেড়াচ্ছেন ফিল্ডিংয়ে। ব্যাটে বলের টোকা, উইকেট ভাঙার শব্দ আর বন্ধুদের হাসি-উল্লাসে মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পায় নদীর শান্ত পরিবেশ।

মাঠের এক কোণে এলোমেলো পড়ে থাকে কয়েকটি সাইকেল, জুতো আর পানির বোতল। এগুলো যেন বলে দেয়, এখানে এসে তারা কিছু সময়ের জন্য ভুলে যেতে চায় ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা জীবনের নানা ব্যস্ততার হিসাব। খেলার প্রতি তাদের একাগ্রতা আর আনন্দই হয়ে ওঠে বিকেলের সবচেয়ে বড় গল্প।

নদীর ওপারে আবছা হয়ে আসা গাছের সারি আর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা বিদ্যুতের বিশাল টাওয়ারগুলো সূর্যাস্তের রঙে মিশে যেন জলরঙে আঁকা কোনো ছবির অংশ হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আলো ফিকে হয়, অন্ধকার নেমে আসে। খেলা শেষের বাঁশি না থাকলেও একসময় ব্যাট-বল গুছিয়ে সবাই বাড়ির পথে হাঁটে। কিন্তু কীর্তনখোলার পাড়ে কাটানো সেই বিকেল, সূর্যাস্তের সেই রঙিন মুহূর্ত আর বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হাসি থেকে যায় স্মৃতির পাতায়।

এই দৃশ্য মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আনন্দগুলো অনেক সময় খুব সাধারণ মুহূর্তের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে। দামি আয়োজন নয়, প্রকৃতির সান্নিধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো কিছু সময়ই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।

সারাদিনের ক্লাস, পরীক্ষা আর পড়াশোনার চাপ শেষে কীর্তনখোলার তীরে ক্রিকেট খেলতে আসা এই তরুণদের দেখে বোঝা যায়, প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকার আনন্দ কতটা নির্মল হতে পারে। এটি শুধু একটি ক্রিকেট ম্যাচ নয়; এটি বন্ধুত্বের, তারুণ্যের, স্বপ্নের এবং মুক্তির এক নীরব উদ্‌যাপন।

নদীর তীরে খেলতে আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী রশিদ শিকদার নিজের অনুভূতির কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রায় সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সুযোগ পেলেই আমরা এই নদীর পাড়ে চলে আসি। কখনো ক্রিকেট খেলি, কখনো ফুটবল। আশপাশের ছেলেরাও আমাদের সঙ্গে যোগ দেয়। নদীর পাড়ের বাতাসে খেলার অনুভূতিটা সত্যিই অন্য রকম। সারাদিনের পড়াশোনা, অ্যাসাইনমেন্ট আর ক্লাসের চাপ শেষে কীর্তনখোলা আমাদের মনে এক ধরনের প্রশান্তি এনে দেয়।’

দিন শেষে সূর্য ডুবে যায়, আলো মিলিয়ে যায়, কিন্তু কীর্তনখোলার তীরে তারুণ্যের এই উচ্ছ্বাস থেমে থাকে না। প্রতিটি বিকেল যেন নতুন করে লিখে যায় বন্ধুত্ব, স্বপ্ন আর জীবনের ছোট ছোট সুখের এক অনবদ্য গল্প।

মেহরাব হোসেন,
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়