০১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০৯

জলাবদ্ধতায় অপরিপক্ব পাট কাটতে বাধ্য যশোরের কৃষক

অকাল জলাবদ্ধতা ও অতিবৃষ্টির কারণে এবার পাটে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন যশোর সদরের কৃষক  © টিডিসি

অকাল জলাবদ্ধতা ও অতিবৃষ্টির কারণে এবার পাটে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন যশোর সদরের কৃষক। ভরা মৌসুমে ক্ষেত ডুবে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে অপরিপক্ব পাট কেটে ফেলতে হচ্ছে। এতে পাটের ফলন ও আঁশের গুণমান যেমন খারাপ হচ্ছে, তেমনই শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় চরম ক্ষতির আশঙ্কায় দিন কাটছে তাদের। সরকারের কাছে পাটের ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা।

আষাঢ়-শ্রাবণের অতিবৃষ্টিতে চরম বিপর্যয়ে যশোর সদরের পাটচাষিরা। নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক মাস আগেই মাঠ থেকে অপরিপক্ব পাট কেটে ফেলতে বাধ্য হচ্ছেন। বর্তমান বাজারে যে দামে পাট বিক্রি হচ্ছে, তাতে খরচের টাকা উঠবে না বলে জানান ভুক্তভোগীরা।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে সাধারণত পাট কাটার উপযুক্ত সময়। কিন্তু আষাঢ় মাস থেকেই মাঠের পর মাঠ প্লাবিত হয়ে পাটগাছের গোড়ায় পচন ধরতে শুরু করেছে। কোনো কোনো ক্ষেতে হাঁটু থেকে কোমর সমানপানি। সে কারণে পাট কাটা ছাড়া উপায় নেই।

রামনগর ও চাঁচড়া ইউনিয়নের হরিণার বিলের ক্ষতিগ্রস্ত চাষিরা জানান, পাটের আঁশ শক্ত বা মোটা হওয়ার আগেই কাটার কারণে এবার কাঙ্ক্ষিত ছাল পাওয়া যাচ্ছে না। ধোয়ার পর পাটের আঁশ একদম নরম ও নিম্নমানের হয়ে যাচ্ছে।

কৃষক পলাশ কুমার সরকার বলেন, যেখানে স্বাভাবিক সময়ে পাঁচ কাঠা জমির পাট কাটে একজন শ্রমিক, সেখানে এখন পানিতে নেমে কাটতে গিয়ে এক কাঠাতেই একজন শ্রমিক লেগে যাচ্ছে। এতে প্রতি কাঠায় শুধু কাটা ও ধোয়ায় প্রায় হাজার টাকা খরচ হচ্ছে।

একই কথা জানান দেবাশীষ পাল। তিনি বলেন, ‘আমার দেড় বিঘা পাটের ভুঁই বিলের নিচে তলিয়ে গেছে। বিঘা প্রতি সার, নিড়ানি ও শ্রমিক বাবদ অন্তত দশ হাজার টাকা খরচ। এখন এক কাঠা কাটতেই একটা শ্রমিক লাগছে। পাটের বাজারদর না বাড়লে চালান বাঁচানোই অসম্ভব।’

জলাবদ্ধতার প্রভাবে শুধু পাটের ক্ষতিই হয়নি, আগামী আমন মৌসুমে ধান চাষও অনিশ্চয়তায় পড়েছে।

কৃষক সুকুমার পাল জানান, পাটের এমন লোকসানের পাশাপাশি তার আট বিঘা জমিতে লাগানোর জন্য তৈরি করা পাঁচ কাঠার ধানের চারা (পাতো) পুরোটাই পানিতে পচে নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে চারা কিনে ধান লাগানো ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই।

কৃষক খোকন বিশ্বাস ও স্বপন কুমার আক্ষেপ করে বলেন, জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে বৃষ্টি শুরু হওয়ায় পাটের ফলন শেষ করে দিয়েছে। আরও এক মাস পর কাটতে পারলে ভালো হতো। এখন পাট ধোবো কীভাবে, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছেন।

বর্তমান বাজারে প্রতি মণ পাট তিন হাজার থেকে তিন হাজার ছয়শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

তবে চাষিদের মতে, এই দরে তাদের উৎপাদন খরচই উঠবে না বলে জানান। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মণ পাটের দাম কমপক্ষে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা না হলে এবার তাদের পথে বসতে হবে।

কৃষক সুকুমার পাল বলেন, বুধবার ব্যাপারিকে জিজ্ঞেস করে জানলাম এখন সাড়ে তিন হাজার থেকে তিন হাজার সাতশ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। যদি পাঁচ হাজার নির্ধারণ হয়, তবে কয়টা টাকা পাব।

পরিস্থিতি পর্যালোচনায় যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, যশোর সদরে মোট এক হাজার সাতশ ২০ একর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে রামনগর ও চাঁচড়া ইউনিয়নের কিছু নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে এবং পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই।

তিনি বলেন, ‘আমরা সরেজমিনে পরিদর্শন করে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি যে পাটগুলো কাটার উপযোগী বা পচন ধরা শুরু করেছে, সেগুলো দ্রুত কেটে ফেলতে। কারণ পানিতে বেশি দিন থাকলে পুরো ফসলটাই নষ্ট হয়ে যাবে। আশা করছি, এখন কেটে ফেললে সম্পূর্ণ ক্ষতির হাত থেকে কিছুটা হলেও রক্ষা পাওয়া যাবে।’