৩০ জুলাই ২০২৬, ১৪:১৮

কর বাড়লেও বাড়েনি নাগরিক সেবা, দুর্ভোগে গলাচিপা পৌরবাসী

টিডিসি সম্পাদিত  © টিডিসি

পৌর শহর মানেই উন্নত সড়ক, কার্যকর ড্রেনেজ, বিশুদ্ধ পানির নিশ্চয়তা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও নিরাপদ নাগরিক জীবন। কিন্তু পটুয়াখালীর গলাচিপা পৌরসভার বাস্তব চিত্র যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রথম শ্রেণির (ক শ্রেণি) পৌরসভার মর্যাদা পাওয়ার এক যুগের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখানকার বাসিন্দারা এখনো ভাঙাচোরা সড়ক, জলাবদ্ধতা, বিশুদ্ধ পানির সংকট, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অপর্যাপ্ত সড়কবাতির মতো মৌলিক সমস্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌরকর বৃদ্ধি ও বাজেটের আকার বড় হলেও নাগরিক সেবার মানে তার প্রতিফলন নেই; বরং বছরের পর বছর একই ধরনের সমস্যায় ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে পৌরবাসীকে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ ৯টি ওয়ার্ড এবং ৩.৩৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে গলাচিপা পৌরসভা ‘গ’ শ্রেণি হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তী সময়ে ‘খ’ শ্রেণি অতিক্রম করে ২০১৩ সালে এটি প্রথম শ্রেণির (ক শ্রেণি) পৌরসভার মর্যাদা লাভ করে। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নাগরিক সেবার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন দৃশ্যমান হয়নি বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।

পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৪১ কোটি ৬১ লাখ ৯০ হাজার ৫৫৭ টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১ কোটি ২৩ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭২ টাকা এবং উদ্বৃত্ত রাখা হয়েছে ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৭৪১ টাকা। যা ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট ধরা হয়েছিল ৫৯ কোটি ৩৮ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭০ কোটি ৬৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩৬৪ টাকা। অর্থাৎ বিভিন্ন সময় বাজেটের পরিমাণ বেড়েছে। এছাড়া ২০২১-২২ অর্থবছরে পৌরকর ছিল ১৩ শতাংশ, যা ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ১৭ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে পঞ্চবার্ষিক কর পুনর্মূল্যায়নের পর নতুন হারে কর আদায় অব্যাহত রয়েছে। তবে কর বাড়লেও সড়ক, ড্রেনেজ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সড়কবাতির মতো মৌলিক সেবায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পৌরবাসী।

সূত্র জানায়, পৌরসভার আওতায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়ক রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান দুটি সড়কের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া কাঁচা ও পাকা মিলিয়ে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ড্রেনের বড় অংশ ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে অকেজো হয়ে আছে। এতে পানি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। পৌর শহরে প্রতিদিন প্রায় ৩-৫ টন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এখনো কোনো নির্ধারিত ডাম্পিং স্টেশন নেই। ফলে খোলা স্থানে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে, যা পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এসব সমস্যা সমাধানে প্যাকেজ প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পৌরসভার অধিকাংশ অভ্যন্তরীণ সড়কই বেহাল। কোথাও ইট-সুরকি উঠে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, কোথাও আবার কংক্রিট ভেঙে রড বেরিয়ে এসেছে। বৃষ্টি হলেই এসব গর্তে পানি জমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে গলাচিপা সরকারি কলেজ থেকে সদর রোড ও টিঅ্যান্ডটি রোড সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে। শহরের প্রধান সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থী স্কুল, কলেজে যাতায়াত করে, এই সড়ক দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ কয়েকটি ইউনিয়নের যোগাযোগ পথ। রাস্তার এই বেহাল অবস্থার কারণে রোগী নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয় স্বজনদের। এ ছাড়া শহরের অনেক লিংক রোড বছরের পর বছর সংস্কার না হওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন পথচারী ও যানবাহন চালকরা।

অন্যদিকে বিভিন্ন এলাকায় পর্যাপ্ত সড়কবাতি না থাকায় সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, অন্ধকারের সুযোগে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনাও বেড়েছে। অন্যদিকে ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সামান্য বৃষ্টিতেই আনন্দপাড়া, মুসলিমপাড়া, শান্তিবাগ, রতনপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। টানা বর্ষণে কোথাও কোথাও হাঁটুপানি জমে বসতঘরেও পানি ঢুকে পড়ে। এতে জনজীবনের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যও ব্যাহত হয়। পানি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও রয়েছে নানা অভিযোগ। পৌরসভার দুটি উচ্চ জলাধার থেকে পানি সরবরাহ করা হলেও অনেক সময় পানিতে শ্যাওলা, পোকা ও ময়লা পাওয়া যায় বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের। বিদ্যুৎ চলে গেলে পানি সরবরাহও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে নিয়মিত কর পরিশোধ করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

পৌরবাসী সালমা আক্তার বলেন, ‘নামেই আমরা পৌরবাসী। রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়, দুর্গন্ধে চলাচল করা যায় না। আবার রাস্তার এমন বেহাল অবস্থা যে হাঁটাচলা করাই কষ্টকর।’

বাসিন্দা মহিউদ্দিন বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। টানা বর্ষণে অনেক এলাকায় হাঁটুপানি জমে, বৃষ্টি বেশি হলেই ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। এই পৌরসভা যেন দীর্ঘদিনের অবহেলার শিকার।’

ব্যবসায়ী আবুল বাসার বলেন, ‘প্রতিবছর পৌরকর বাড়ছে, কিন্তু নাগরিক সেবা বাড়ছে না। বিদ্যুৎ না থাকলে পানি আসে না। রাস্তা ও ড্রেনের সমস্যায় ক্রেতাদের যাতায়াতে অসুবিধা হয়, এতে ব্যবসাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

অটোরিকশাচালক আলী আকবর বলেন, ‘রাস্তায় বড় বড় গর্ত থাকায় প্রায়ই গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়। রাতে অনেক এলাকায় সড়কবাতি না থাকায় চলাচল আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানুষজন রাস্তা ভাঙার কারণে গাড়িতে না চড়ে হেঁটে গন্তব্য পৌঁছায়।’

কলেজশিক্ষার্থী জুয়েল বলেন, ‘প্রতিদিন ভাঙাচোরা সড়ক দিয়ে কলেজে যেতে খুব কষ্ট হয়। বর্ষাকালে কাদা ও জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়, অনেক সময় কাদাপানিতে পোষাক নষ্ট হয়ে যায়। দ্রুত সড়ক সংস্কার করা দরকার।’

গলাচিপা পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবু আউয়াল জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপির আওতায় প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ ৮০ হাজার ২ টাকা ব্যয়ে ১৭টি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ-সংস্কার, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন, ড্রেন পরিষ্কার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্ট্রিট ও সোলার লাইট স্থাপন, ব্রিজ নির্মাণ এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন। অনুমোদন পেলে দ্রুত টেন্ডারের মাধ্যমে কাজ শুরু হবে।

এ বিষয়ে গলাচিপা পৌর প্রশাসক আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, ‘পৌর এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে আমরা ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছি। শিগগিরই টেন্ডার আহ্বান করা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ও বেহাল সড়কগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে পৌরবাসীর দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান করা হবে।’

এদিকে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের বসবাস গলাচিপা পৌরসভায়। অথচ এখনো কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্তবিনোদন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। সম্প্রতি নদীতীরে একটি মিনি পার্ক নির্মাণ করা হলেও সেখানে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই। ফলে প্রথম শ্রেণির পৌরসভার মর্যাদা পেলেও কাঙ্ক্ষিত নাগরিক সেবা থেকে এখনো বঞ্চিত রয়েছেন গলাচিপার বাসিন্দারা।