বেড়িবাঁধ ভাঙার আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ
একসময় বুড়া গৌরাঙ্গ নদীর তীব্র ঢেউ থেকে জনপদকে রক্ষা করত যে বেড়িবাঁধ, আজ সেই বাঁধই অস্তিত্ব সংকটে। নদীর ভয়াবহ ভাঙনে পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার রতনদী-তালতলী ইউনিয়নের বদনাতলী লঞ্চঘাট এলাকার ৫৫/১ পোল্ডারের বেড়িবাঁধ ও তার ওপর নির্মিত সড়ক মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রতিদিন নদী গিলে খাচ্ছে তীরবর্তী এলাকা, আর ভাঙনের আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের কয়েকশ পরিবার।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে গ্রাম রক্ষা বাঁধের ওপর নির্মিত পাকা সড়কের বড় একটি অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অবশিষ্ট অংশেও দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। এতে যানবাহন চলাচল প্রায় অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। প্রতিটি জোয়ারে বেড়িবাঁধের আরও অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা স্থানীয়দের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে পুরো বেড়িবাঁধ। সেক্ষেত্রে জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হবে ১১ টি গ্রামের কয়েকশ বসতবাড়ি, শত শত একর কৃষিজমি এবং বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল। পানিবন্দী হয়ে পড়বে ২৫শত পরিবার পাশাপাশি হুমকির মুখে পড়বে বদনাতলী থেকে উলানিয়া বাজার পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ। এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ ও বিভিন্ন ধরনের মালবাহী যানবাহন চলাচল করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বুড়া গৌরাঙ্গ নদীর এই অংশে দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। অতীতে কয়েক দফা জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করা হলেও তা ছিল সাময়িক সমাধান। বর্তমানে নদী ভাঙতে ভাঙতে মূল বেড়িবাঁধের একেবারে গা ঘেঁষে চলে এসেছে। কয়েকদফা বাড়িঘর সরিয়েও ভাঙন থেকে রক্ষা পাচ্ছেনা বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দা এ্যাড. মো. খবির হোসেন বলেন, ‘স্বাভাবিক জোয়ারের থেকে বেশি পানি হলেই নদীর তীব্র ঢেউয়ের আঘাতে বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে যাবে। সেই জন্য এলাকার স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে নদীর ভাঙন ঠেকানো প্রয়োজন। বর্তমানে জিওব্যাগ ফেলা হলেও ভাঙন ঠেকাতে তা যথেষ্ট নয়। এই বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলে চরাঞ্চলের সাথে সহজ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।’
নদীপাড়ের বাসিন্দা জামিলা বেগম বলেন, ‘নদীভাঙনে আমরা অনেক পরিবার সর্বস্ব হারিয়েছি। আগে একবার বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল, কিন্তু সেটি টেকেনি। এরপর অনেক অফিসার এসে দেখে গেছেন। তারা ব্লক ফেলবে বলছেন। আবার ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কারের আশ্বাস দিলেও কার্যকর কোন ব্যবস্থা নেয়নি। এখন সরকার পদক্ষেপ নিলে আমরা পরিবার ও ঘরবাড়ি নিয়ে নিরাপদে বেঁচে থাকার সুযোগ পাব।’
এদিকে এখন আমন ধান রোপণের মৌসুম। এমন সময়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে গেলে কৃষিজমি লবণাক্ত বা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গিয়ে কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। তাই স্থানীয়রা জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধ এবং স্থায়ী ও টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় কৃষক রুস্তম আলী বলেন, ‘বাঁধ ভেঙে গেলে কয়েকশ হেক্টর আবাদি জমি জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাবে। এতে আমাদের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হবে। নদীভাঙনের কারণে বদনাতলী এলাকার মানুষ এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।’
শুধু বদনাতলী এলাকা নয় নদী ভাঙনের কবলে পড়েছে উপজেলার আমখোলা ইউনিয়নের সড়ক, ডাকুয়া ইউনিয়নের আটখালী গ্রামের আঞ্চলিক সড়ক। রামনাবাদ নদীর ভাঙনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে এই প্রধান সড়ক। কয়েকদফা বরাদ্দ ও জিওব্যাগ ফেলেও সেখানে ভাঙনরোধ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া বকুলবাড়িয়া ইউনিয়নের রনুয়া বাজার, চিকনিকান্দি ইউনিয়নের প্রাচীন সুতাবাড়িয়া মন্দির এলাকা, পানপট্টি, চরকাজল ও চরবিশ্বাস ইউনিয়নেও নদী ভাঙনে বিলীন হচ্ছে জনপদ।
এ বিষয়ে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হাসান বলেন, ‘বর্তমানে গলাচিপা উপজেলার ৫৫/১ পোল্ডারের আওতায় মোট ৪১ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। বর্ষা চলে আসায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ করা যাচ্ছে না। তবে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ এলাকায় জরুরি মেরামতের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্থানে জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে। কাজটি বাস্তবায়ন হলে নদী ভাঙন রোধ হবে।’
এদিকে নদী ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের প্রতিনিধি আবু নাঈম। তিনি নদী ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস প্রদান করেন। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এখন পর্যন্ত নেওয়া পদক্ষেপ পরিস্থিতির তুলনায় যথেষ্ট নয়। তাদের দাবি, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই দ্রুত ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে নদীর অব্যাহত ভাঙনে শুধু বেড়িবাঁধ নয়, ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে পারে পুরো জনপদ। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।