কচুরিপানায় ঢেকে গেছে ঝিনাইদহের ১৩ নদ-নদী, অপসারণে নেই বাজেট
কচুরিপানার দখলে চলে গেছে ঝিনাইদহের ১৩টি নদ-নদীর প্রায় সবকটিই। এতে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কমছে নদ-নদীর নাব্যতা, হুমকির মুখে পড়ছে জলজ জীববৈচিত্র্য এবং বর্ষা মৌসুমে বাড়ছে জলাবদ্ধতা ও বন্যার আশঙ্কা। তবে কচুরিপানা অপসারণে প্রয়োজনীয় সরকারি বাজেট না থাকায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জেলার নবগঙ্গা, কুমার, চিত্রা, ভৈরব, কপোতাক্ষ, বেগবতী, কালীগঙ্গা, কোদলা, গড়াই, বেতনাসহ বিভিন্ন নদ-নদী ও শাখা-খালে কচুরিপানার ব্যাপক বিস্তার দেখা গেছে। বিশেষ করে কালীগঞ্জ, ঝিনাইদহ সদর, শৈলকুপা, হরিণাকুণ্ডু, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলার নদী-খালগুলোতে কচুরিপানার ঘন স্তর পানির স্বাভাবিক প্রবাহে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানা মাসের পর মাস নদীতে জমে থাকে। নিয়মিত অপসারণ না হওয়ায় নদীর তলদেশে পলি জমে নাব্যতা কমে যাচ্ছে। অনেক স্থানে নৌকা চলাচলও প্রায় বন্ধ হয়ে পড়েছে।
কালীগঞ্জ উপজেলার তৈলকুপী গ্রামের বাসিন্দা তহিদুল বলেন, আগে সারা বছর নদীতে ডুঙ্গা চলত। এখন কচুরিপানায় নদী ঢেকে থাকায় অনেক সময় পানিই দেখা যায় না। বর্ষায় পানি নামতে দেরি হওয়ায় আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
শৈলকুপার কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, নদী ও খালে কচুরিপানা জমে থাকায় সেচের পানি চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। অনেক খাল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
মৎস্যজীবী আব্দুস সামাদ জানান, আগে জাল ফেললেই বিভিন্ন প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন মাছের পরিমাণ অনেক কমে গেছে। কচুরিপানার কারণে জাল ফেলতেও সমস্যা হয়, অনেক সময় জাল ছিঁড়েও যায়।
অপর মৎস্যজীবী বিপুল হোসেন বলেন, কচুরিপানার ঘন স্তরের কারণে সূর্যের আলো পানির নিচে পৌঁছায় না। এতে পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে গিয়ে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণ ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় পরিবেশবাদী ও সোনার বাংলা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শিবুপদ বিশ্বাস বলেন, কচুরিপানার কারণে নদীর পানি স্থির হয়ে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হচ্ছে এবং মশার উপদ্রব বাড়ছে। নদী ও খালের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে পানি দ্রুত নিষ্কাশনও সম্ভব হচ্ছে না।
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (অ.দা.) রঞ্জন কুমার দাস বলেন, শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া, নদীতে পলি জমা এবং উজান থেকে ভেসে আসা কচুরিপানার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে কচুরিপানা অপসারণের জন্য তাদের কোনো সরকারি বাজেট নেই। তিনি জানান, নদী খনন ও রক্ষণাবেক্ষণ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্ব হলেও কচুরিপানা অপসারণে আলাদা বরাদ্দ প্রয়োজন।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মুন্তাসির রহমান বলেন, কচুরিপানার কারণে নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। সূর্যের আলো পানির নিচে না পৌঁছানোয় দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে গিয়ে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি জানান, বিষয়টি নদী রক্ষা কমিটির সভায় উত্থাপন করা হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অভিজিৎ শিল বলেন, ঝিনাইদহের ১৩টি নদীর প্রায় সবগুলোই কচুরিপানায় আক্রান্ত। এটি অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি বরাদ্দ না থাকায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কচুরিপানার কারণে দেশি প্রজাতির মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।