বন্যায় ২০ হেক্টরের ১৬ হেক্টর পেঁপে বাগানই ক্ষতির মুখে, বিপাকে ১৯৭ চাষি
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় বন্যার পানি পুরোপুরি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনজীবনে স্বস্তি ফিরেছে। কিন্তু পেঁপে চাষিদের জীবনে নেমে এসেছে নতুন দুর্যোগ। কারণ, বিস্তীর্ণ পেঁপে বাগানজুড়ে এখন শুধুই ধ্বংসের চিহ্ন। কোথাও গোড়া পঁচে হেলে পড়েছে গাছ, আবার কোথাও ঝরে পড়েছে কাঁচা ফল। সবুজে মোড়া যে বাগান কয়েক সপ্তাহ আগেও কৃষকের স্বপ্ন আর জীবিকার প্রতীক ছিল, সেখানে এখন হতাশা আর দীর্ঘশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সাম্প্রতিক বন্যায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ২০ হেক্টর পেঁপে বাগানের মধ্যে ১৬ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ১৯৭ জন পেঁপে চাষি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাদের মধ্যে পুরানগড়, ছদাহা, ধর্মপুর, কাঞ্চনা ও কালিয়াইশ ইউনিয়নের পেঁপে চাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব ইউনিয়নের বাগানগুলোতে কয়েক দিন ধরে বন্যার পানি জমে থাকায় অধিকাংশ গাছের শিকড় পঁচে গেছে। তাই গাছের গোড়ায় ওষুধ প্রয়োগ করেও অধিকাংশ গাছ বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
সরেজমিনে উপজেলার পুরানগড় ইউনিয়নের কালীনগর ও ধর্মপুর ইউনিয়নের কুন্ডুকুল গ্রামের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি পেঁপে বাগানেই বন্যার ক্ষত স্পষ্ট। বিস্তীর্ণ বাগানজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কাঁচা ও আধাপাকা পেঁপে। কোথাও গাছের গোড়া পঁচে গাছ হেলে পড়েছে, আবার কোথাও পুরো গাছ মাটিতে লুটিয়ে আছে। দাঁড়িয়ে থাকা অধিকাংশ গাছের পাতাও বিবর্ণ হয়ে গেছে। কয়েকজন চাষি শুকিয়ে যাওয়া গাছের গোড়ায় জিপসাম সার প্রয়োগ করে বেঁচে থাকা গাছগুলো রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে বন্যার সময় গাছগুলো পানির নিচে থাকায় অধিকাংশ গাছের শিকড় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চলতি মৌসুমে ৪০ শতক জমিতে হাইব্রিড জাতের রেড লেডি পেঁপের চাষ করেছেন ধর্মপুর ইউনিয়নের কুন্ডুকুল গ্রামের আমির হোসেন। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) থেকে ঋণ নিয়ে পেঁপে বাগান করেছিলাম। সবেমাত্র ফলন আসতে শুরু করেছিল। ভেবেছিলাম, এ মৌসুমে ভালো লাভ হবে। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে আমার প্রায় ২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।’
তার মতো একই গ্রামের আমজাত হোসেন দুলাল ২০ শতক জমিতে হাইব্রিড জাতের টপ লেডি পেঁপে এবং চাঁদেরপাড়া গ্রামের মোহাম্মদ শাহিন ২৫ শতক জমিতে রেড লেডি পেঁপে চাষ করেছেন। এ ছাড়া কালিয়াইশ ইউনিয়নের জয়নাল আবেদীন ও হেলাল উদ্দীনও হাইব্রিড জাতের পেঁপে চাষ করে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।
তারা জানান, পেঁপে চাষই ছিল তাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। গত কয়েক মাস ধরে পরিচর্যা করলেও একবারও পেঁপে বিক্রি করতে পারেননি। ফলন আসতে শুরু করার এমন পর্যায়ে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢল তাদের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছে।
পুরানগড় ইউনিয়নের কালীনগর গ্রামের পেঁপে চাষি বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘প্রায় ১ একর জমিতে হাইব্রিড জাতের টপ লেডি ও রেড লেডি পেঁপের চাষ করেছিলাম। এতে আমার সাড়ে ৩ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। কিন্তু বন্যার পানি সব শেষ করে দিয়েছে। পানি নেমে যাওয়ার পর মনে হয়েছিল, কিছু গাছ হয়তো বেঁচে যাবে। কিন্তু এখন একের পর এক সব গাছ শুকিয়ে যাচ্ছে। বাগানের দিকে তাকালেই কষ্ট লাগে। নতুন করে চাষ শুরু করার মতো পুঁজিও নেই।’
পাইকারি সবজি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, এখানকার উৎপাদিত বিভিন্ন জাতের পেঁপে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চট্টগ্রাম নগরীসহ কুমিল্লার নিমসার বাজার, ফেনী, নোয়াখালী ও কক্সবাজারের উখিয়ার বিভিন্ন কাঁচা সবজির আড়তে সরবরাহ করা হতো। কিন্তু বন্যার কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে পেঁপের সংকট দেখা দিয়েছে। বর্তমানে উত্তরবঙ্গের পেঁপে এখানকার চাহিদা মেটাচ্ছে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ঝুমুর চৌধুরী বলেন, ‘আমার ব্লকে প্রায় ২৫ জন পেঁপে চাষি রয়েছেন। এখানকার অধিকাংশ পেঁপে বাগান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু গাছ বেঁচে থাকলেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। মূলত পেঁপে গাছ দীর্ঘ সময় জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। কয়েক দিন পানি জমে থাকলে শিকড়ে ছত্রাকের আক্রমণে গোড়া পঁচে যায়।’
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘লাভজনক হওয়ায় গত কয়েক বছরে পেঁপে চাষের পরিধি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যায় অধিকাংশ পেঁপে বাগানের উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। আমরা প্রতিটি ইউনিয়নের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা সংগ্রহ করেছি। প্রস্তুতকৃত তালিকা ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।’