২৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৩

প্রশাসনের নির্দেশনা উপেক্ষা, ভিমরুলী পেয়ারাবাগানে একের পর এক দুর্ঘটনায় কঠোর পদক্ষেপের দাবি এলাকাবাসীর

ভিমরুলী ভাসমান পেয়ারা হাটে ডুবে যাওয়া পেয়ারা বোঝাই একটি ডিঙি নৌকা  © টিডিসি ছবি

ঝালকাঠির সদর উপজেলার কীর্তিপাশা-ভিমরুলীসহ বিভিন্ন পেয়ারাবাগান এলাকায় পর্যটকদের চলাচল ও নৌভ্রমণে উচ্চশব্দে গান বাজানো, অশালীন নৃত্য, বেপরোয়া ট্রলার চলাচল এবং পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। পর্যটন এলাকার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, জনশৃঙ্খলা ও স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা রক্ষায় উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার সতর্কতা ও নির্দেশনা জারি করলেও তা উপেক্ষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 

তাদের দাবি, প্রশাসনের বারবার আহ্বান সত্ত্বেও এক শ্রেণির ভ্রমণপিপাসু নির্ধারিত নিয়মকানুন মানছেন না। ফলে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে, ব্যাহত হচ্ছে এলাকার পরিবেশ ও জনজীবন। স্থানীয়রা এখন শুধু সতর্কীকরণ নয়, বরং নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্রুতগতির ট্রলারের কারণে পেয়ারা বোঝাই চাষিদের ডিঙি নৌকা ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। এতে কৃষকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পাশাপাশি কিশোরদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কারণেও প্রাণহানির মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে। শুক্রবার (২৪ জুলাই) সকাল ১০টা থেকে ঝালকাঠি সদর উপজেলার ভীমরুলী ভাসমান হাটে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে পর্যটকদের আগমন শুরু হয়। 

এছাড়া, সাউন্ড বক্সে উচ্চমাত্রায় গান বাজিয়ে পুরো পরিবেশকে ভারী করে তোলা হয়। দ্রুতগতির ট্রলারের সৃষ্ট পানির ঢেউয়ে পেয়ারা বোঝাই কয়েকটি ডিঙি নৌকা ডুবে যায়। এর আগে গত ১৭ জুলাই কিশোর পর্যটক সানি (১৩) আমগাছ থেকে খালে লাফিয়ে পড়ে নিখোঁজ হয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। 

স্থানীয়দের মতে, পর্যটকদের বেপরোয়া আচরণ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে এমন দুর্ঘটনা বাড়ছে। এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং পরিবেশ, প্রকৃতি, শৃঙ্খলা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ঝালকাঠি সদর উপজেলা প্রশাসন একটি নির্দেশনামূলক নোটিশ জারি করেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেগুফতা মেহনাজ স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, ঝালকাঠি সদর উপজেলাধীন কীর্তিপাশা ইউনিয়নের ভিমরুলী পেয়ারা বাগান ও ভাসমান পেয়ারার বাজার ভ্রমণপিপাসুদের জন্য অত্যন্ত সমাদৃত একটি স্থান। 

প্রতিদিন দেশি-বিদেশি অসংখ্য পর্যটক এখানে ভ্রমণে আসেন। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বাগানের স্বাভাবিক পরিবেশের ইকোলজিক্যাল ব্যালেন্স এবং স্থানীয় জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অব্যাহত রাখতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

নোটিশে বলা হয়েছে:
১. পেয়ারা বাগান পরিভ্রমণকালে ডিজে সিস্টেম, লাউডস্পিকার এবং উচ্চ ভলিউমের সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কারণ এসব শব্দ স্থানীয় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করে এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থলের জন্য হুমকি সৃষ্টি করে। ২. ইঞ্জিনচালিত বড় ট্রলার নিয়ে ভাসমান পেয়ারা বাজার বা বাগানের ভেতরে প্রবেশ করা যাবে না। বড় ট্রলারের কারণে বাগানের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয় এবং জলজ ও স্থলজ প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৩. পর্যটকদের ছোট ও মাঝারি আকারের ইঞ্জিনবিহীন নৌযান ব্যবহারের জন্য অনুরোধ করা হয়েছে, যাতে বাগানের পরিবেশ ও ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য বজায় থাকে। ৪. পর্যটকদের সঙ্গে আনা খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ, পলিথিন, প্লাস্টিক, বোতল ও অন্যান্য বর্জ্য পানিতে ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। প্রতিটি নৌযানে অন্তত একটি করে ডাস্টবিন রাখতে হবে।৫. পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি ট্রলার বা নৌযানে পর্যাপ্ত পরিমাণ লাইফ জ্যাকেট ও লাইফ বয়া রাখা বাধ্যতামূলক। দুর্ঘটনার ঝুঁকি এড়াতে চালক ও পর্যটকদের সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ৬. ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে কোনো ট্রলার বা নৌযান চলাচল করতে পারবে না। অতিরিক্ত যাত্রী বহন যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। ৭. অনুমতি ছাড়া পেয়ারা বাগানে প্রবেশ, পেয়ারা বা আমড়া সংগ্রহ এবং গাছের ডালপালা ছেঁড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পর্যটকদের শালীনতা বজায় রাখা, ইভটিজিং থেকে বিরত থাকা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সকল বিধি-বিধান মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। ৮. এসব নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

নোটিশে আরও বলা হয়েছে, ‘আসুন সবাই মিলে ভাসমান পেয়ারা বাজার ও পেয়ারা বাগানের পরিবেশ সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও পর্যটকবান্ধব রাখি। এ বাগান আমাদের সম্পদ। এ সম্পদ রক্ষায় সবাই সচেতন হই। পর্যটন এলাকার সুন্দর ও নান্দনিক পরিবেশ বজায় রাখা এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় সকলের সচেতনতা ও সহযোগিতা একান্ত কাম্য।’ জনস্বার্থে এ আদেশ জারি করা হয়েছে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রশাসনের নির্দেশনা জারির পরও অনেক পর্যটক তা মানছেন না। অনেকেই নৌযানে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে, অশোভন আচরণ করে এবং অশালীন নৃত্যে মেতে উঠে শব্দদূষণ সৃষ্টি করছেন। পাশাপাশি ব্যবহৃত প্লাস্টিকের প্যাকেট, বোতল, খাবারের মোড়কসহ বিভিন্ন বর্জ্য খাল, নদী ও আশপাশের জলাশয়ে ফেলে পরিবেশ দূষণ করছেন। 

এতে পেয়ারাবাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া অতিরিক্ত ভিড়, অনিয়ন্ত্রিত নৌচলাচল এবং প্রশাসনের জারি করা বিভিন্ন বিধিনিষেধ অমান্যের ঘটনায় পর্যটন এলাকার নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক ও নৌযান চালকেরা। তাদের ভাষ্য, পর্যটকদের বেপরোয়া চলাচলের কারণে কৃষকেরা ঝুঁকি নিয়ে পেয়ারা পরিবহন করছেন এবং প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

আরও দেখুন : এইচএসসি পাসে এসিআইতে সেলস অফিসার নিয়োগ

স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, শুধু নোটিশ বা সতর্কীকরণে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, তাৎক্ষণিক জরিমানা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাদের মতে, কার্যকর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন এলাকায় শৃঙ্খলা বজায় থাকবে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে এবং দর্শনার্থীরাও নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক পরিবেশে ভ্রমণের সুযোগ পাবেন।

এ বিষয়ে ঝালকাঠি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেগুফতা মেহনাজ বলেন, ‘পরিবেশ ও শৃঙ্খলা রক্ষায় নোটিশ জারি করা হয়েছে। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ভিমরুলীর ভাসমান পেয়ারা বাজার ও পেয়ারাবাগানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং পর্যটনের আকর্ষণ ধরে রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। অন্যথায় অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, বেপরোয়া ট্রলার চলাচল, শব্দদূষণ ও পরিবেশদূষণের কারণে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় এই প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্রের সৌন্দর্য ও স্বকীয়তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।