২২ জুলাই ২০২৬, ১৭:৫২

খাগড়াছড়ির বন্যাকবলিত এলাকায় ৩ মাস কিস্তি আদায় করতে পারবে না ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো

খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা এনজিও বিষয়ক সমন্বয় সভা  © টিডিসি ফটো

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগকে পুঁজি করে কোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান কিস্তি আদায় করতে পারবে না। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের তিন মাসের কিস্তি আদায় সম্পূর্ণ স্থগিত রাখতে হবে। এই নির্দেশনা অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বুধবার (২২ জুলাই) বিকেলে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা এনজিও বিষয়ক সমন্বয় সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বন্যাদুর্গত ঋণগ্রহীতাদের জন্য তিন মাস কিস্তি আদায় স্থগিত রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।

সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছ থেকে সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে ঋণের কিস্তি আদায়ের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস মেহেদী, মং সার্কেলের চিফ সাচিংপ্রু চৌধুরী, খাগড়াছড়ি প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এইচ এম প্রফুল্ল এবং জেলায় কর্মরত বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের ফলে খাগড়াছড়িসহ চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভয়াবহ বন্যায় বিপর্যস্ত হয়েছে। বিশেষ করে খাগড়াছড়ির বিভিন্ন উপজেলা ও দুর্গম অঞ্চলের অসংখ্য পরিবার ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং জীবিকার উৎস হারিয়ে গভীর সংকটে পড়েছে। ফলে ক্ষুদ্রঋণ গ্রহণকারী পরিবারগুলোর পক্ষে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এ পরিস্থিতিতে খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়ার পরামর্শক্রমে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, গণমাধ্যমকর্মী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ সমন্বিতভাবে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে বলেও উল্লেখ করা হয়। এই সমন্বিত উদ্যোগকে দুর্যোগ মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংহতির একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত করা হয়।

সভায় জানানো হয়, ১৩ জুলাই জারি করা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) নির্দেশনা অনুযায়ী বন্যাকবলিত এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে আগামী তিন মাস কোনো ধরনের কিস্তি আদায় করা যাবে না। কিন্তু কয়েকটি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান এ নির্দেশনা অমান্য করে কিস্তি আদায় এবং ঋণগ্রহীতাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে— এমন অভিযোগ প্রশাসনের কাছে এসেছে।

বক্তারা বলেন, জাতীয় দুর্যোগের এমন সংকটময় সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা শুধু অমানবিকই নয়, বরং সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনারও লঙ্ঘন। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মিললে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে কোনো ধরনের শিথিলতা দেখানো হবে না।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, কিস্তি স্থগিত রাখার পাশাপাশি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে জরুরি খাদ্য সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ, ত্রাণসামগ্রী বিতরণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য দুর্যোগকালীন বিশেষ ঋণ সুবিধা চালুর বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে।

সভা শেষে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা সংশ্লিষ্ট সব ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে এমআরএর নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই এখন সবার নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। সরকারি সিদ্ধান্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে এবং তাদের জীবিকা পুনর্গঠনের পথ আরও সহজ হবে।

সংবাদ সম্মেলনে জেলার সব এনজিও ও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানকে তিন মাস কিস্তি স্থগিতের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয় এবং দুর্যোগকবলিত মানুষের প্রতি সর্বোচ্চ মানবিক সংবেদনশীলতা প্রদর্শনের অনুরোধ জানানো হয়।