২২ জুলাই ২০২৬, ১৩:৫৮

টিফিন-ছুটির ঘণ্টা বাজলেই থেমে যায় শৈশব, শুরু হয় মাহিমের জীবনসংগ্রাম

বাদামের প্যাকেট হাতে মাহিম  © সংগৃহীত

টিফিনের ঘণ্টা বাজলেই যখন সহপাঠীরা মাঠে খেলায় মেতে ওঠে, তখন আট বছরের মাহিমের হাতে উঠে আসে বাদামের ঝুড়ি। বাবাকে হারানোর পর সংসারের হাল ধরতে মেহেরপুরের এই দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীকে স্কুলের টিফিন ও ছুটির পর বাদাম বিক্রি করে পরিবারের খরচে সহায়তা করতে হচ্ছে, তবু চোখে তার স্বপ্ন—লেখাপড়া করে একদিন বড় মানুষ হওয়ার।

দেড় বছর আগে স্ট্রোকে মাহিমের বাবা মান্নান আলী মারা যান। এরপর মা শিল্পী খাতুন, ছোট বোন এবং মাহিমকে নিয়ে পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে। কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকায় বাধ্য হয়েই ছোট্ট মাহিমের হাতে তুলে দেওয়া হয় বাদামের প্যাকেট।

প্রতিদিন সকালে বিদ্যালয়ে এসে নিয়মিত ক্লাস করে মাহিম। কিন্তু টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই যখন অন্য শিক্ষার্থীরা মাঠে খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন সে হাতে বাদামের ঝুড়ি নিয়ে স্কুল প্রাঙ্গণ ও আশপাশে বিক্রি শুরু করে। বিদ্যালয় ছুটির পরও সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে তার এই সংগ্রাম। এরপর বাড়ি ফিরে ক্লান্ত শরীর নিয়েই বসতে হয় পড়ার টেবিলে।

মাহিম বলে, ‘আমি লেখাপড়া করে বড় মানুষ হতে চাই। বাবার মতো কষ্ট করতে চাই না। বাদাম বিক্রি করি, কারণ বাসায় টাকা লাগে। সবাই যখন খেলে, আমারও খেলতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আগে বাদাম বিক্রি করতে হয়।’

শিশুটির মা শিল্পী খাতুন চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, ‘স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসার চালানো খুব কঠিন হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় কাজ খুঁজেছি, কিন্তু নিয়মিত কাজ পাইনি। বাধ্য হয়েই ছেলের হাতে বাদাম তুলে দিয়েছি। একজন মা হিসেবে এটা খুব কষ্টের। আমি চাই আমার ছেলে শুধু লেখাপড়া করুক। সরকার বা কোনো সহৃদয় ব্যক্তি পাশে দাঁড়ালে ওকে আর বাদাম বিক্রি করতে হবে না।’

মাহিমের সহপাঠী লাবিব হাসান বলে, ‘টিফিনের সময় আমরা খেলি, কিন্তু মাহিম বাদাম বিক্রি করে। আমরা চাই ও আমাদের সঙ্গে খেলুক।’

সহপাঠী রাসেল হোসেন বলেন, ‘মাহিম খুব ভালো ছাত্র। স্যার যা পড়ান, সবই পারে। ওর যেন আর কষ্ট না করতে হয়।’

বিদ্যালয়ে ব্যাগ কাঁধে বাদাম বিক্রি করছে মাহিম

আরেক সহপাঠী রাজ বলে, ‘মাঝে মাঝে মাহিমের কাছ থেকে বাদাম কিনি। ও সবসময় হাসিমুখে থাকে, কিন্তু বুঝি ও অনেক কষ্ট করে।’

স্থানীয় বাসিন্দা আলেক হোসেন বলেন, ‘মাহিম শুধু একটি শিশুর নাম নয়, সে সমাজের অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত শিশুর প্রতিচ্ছবি। দারিদ্র্য তাদের শৈশব কেড়ে নিচ্ছে। যথাসময়ে সরকারি ও সামাজিক সহায়তা পেলে তারাও স্বপ্ন পূরণের সুযোগ পাবে।’

আরেক বাসিন্দা আরিফ হোসেন বলেন, ‘মাহিমের ছোট্ট দুটি হাত বাদাম বিক্রি করছে, কিন্তু সুযোগ পেলে সেই হাতই একদিন সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে পারে। প্রয়োজন শুধু সমাজ ও রাষ্ট্রের আন্তরিক সহযোগিতা।’

ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাহিম নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসে এবং পড়াশোনায় মনোযোগী। পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে তাকে বাদাম বিক্রি করতে হচ্ছে। বিষয়টি আমাদের ব্যথিত করে। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করা হচ্ছে। তবে শিশুটির জন্য সরকারি ও সামাজিক সহায়তা খুবই প্রয়োজন।’

দারিদ্র্যের নির্মম বাস্তবতায় মাহিমের শৈশব আজ হারিয়ে যাচ্ছে জীবিকার সংগ্রামে। তবু তার চোখে স্বপ্ন একদিন লেখাপড়া করে বড় মানুষ হবে। এখন প্রয়োজন সমাজের মানবিক মানুষ এবং রাষ্ট্রের কার্যকর সহায়তা, যাতে বাদামের ঝুড়ির পরিবর্তে তার হাতে থাকে শুধু বই-খাতা আর স্বপ্ন পূরণের সাহস।