ভারী বর্ষণে মওলানা ভাসানী সেতুর সংযোগ সড়কে ধস, বাড়ছে দুর্ঘটনার শঙ্কা
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে হরিপুর-চিলমারী মওলানা ভাসানী তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কের একাংশে বড় ধরনের ধস দেখা দিয়েছে। আর্চ ব্রিজের ঠিক পাশেই তৈরি হওয়া এই বিশাল গর্তের কারণে চরম ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে পথচারী ও যানবাহন। যেকোনো মুহূর্তে সড়কটি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
দেশের অন্যতম ব্যয়বহুল এই সেতুর সংযোগ সড়কে এমন ধসের ঘটনায় নির্মাণকাজের মান ও দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তারা দ্রুত ধসের কারণ তদন্ত করে স্থায়ীভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
জানা যায়, বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্টের (এসএফডি) অর্থায়নে প্রায় ৯২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ৪৯০ মিটার দীর্ঘ ও ৯.৬ মিটার প্রশস্ত এই সেতু গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের হরিপুরকে কুড়িগ্রামের চিলমারীর সঙ্গে সংযুক্ত করেছে।
ঢাকার হাতিরঝিলের আদলে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই আর্চ ব্রিজটি উদ্বোধনের পর থেকেই উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোতে পরিণত হয়। প্রতিদিন অসংখ্য যানবাহনের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা সেতুটি দেখতে আসেন। কিন্তু নির্মাণের মাত্র দেড় বছরের মাথায় সংযোগ সড়কের এই বেহাল দশায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও নানামুখী প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, টানা ভারী বর্ষণে আর্চ ব্রিজের সংযোগস্থলের মাটি ধসে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। দায়িত্বরত কর্মীরা সাময়িকভাবে বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছেন। তবে ঝুঁকি নিয়েই ওই স্থান দিয়ে চলাচল করছে ঢাকাগামী বাসসহ বিভিন্ন যানবাহন।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘দেশের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতুর সংযোগ সড়ক দুই-তিন দিনের বৃষ্টিতেই ধসে পড়বে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। এ ধস দেখার পর থেকে আমাদের ভীষণ ভয় কাজ করছে।’
রংপুর থেকে সেতু দেখতে আসা দর্শনার্থী মোছা. ফরিদা পারভীন বলেন, ‘সেতুর পাশেই এমন গর্ত তৈরি হওয়া খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে প্রতিদিন অনেক মানুষ ছবি তোলেন। উদ্বোধনের এক বছর না ঘুরতেই এমন অবস্থা সত্যিই উদ্বেগজনক।’
বগুড়া থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা রবিউল ইসলাম বলেন, ‘এত বড় প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে। অথচ কয়েক দিনের বৃষ্টিতেই সংযোগ সড়কে ধস দেখা দিয়েছে। এতে নির্মাণকাজের মান নিয়েই প্রশ্ন উঠছে।’
সেতু দেখতে আসা আরেক দর্শনার্থী মনিরা খাতুন বলেন, ‘হাতিরঝিলের আদলে নির্মিত এই সেতুটি দেখতে এসেছিলাম। কিন্তু সংযোগ সড়কের এই দশা দেখে ভয় লাগছে। এত দ্রুত সড়ক নষ্ট হওয়ার পেছনে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি থাকতে পারে।’
ঢাকাগামী বাসচালক আনসার আলী জানান, সেতুর বাঁকের মুখে গর্তটি হওয়ায় গাড়ি চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় বাস উল্টে যেতে পারে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এই রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে।
হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোজাহারুল ইসলাম বলেন, ‘কুড়িগ্রামের সঙ্গে গাইবান্ধার যোগাযোগের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক। নির্মাণের দেড় বছরেই এমন ধস কেউ আশা করেনি। আমি দ্রুত স্থায়ীভাবে মেরামতের দাবি জানাচ্ছি।’
তবে নির্মাণকাজে গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিপা এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি এটিএম ইঞ্জিনিয়ার মাজেদ আজাদ বলেন, ধসে যাওয়া অংশে আপাতত মেরামতের কাজ চলছে। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। আর্চ সেতুর সংযোগ সড়কের দুই পাশে পানিনিষ্কাশনের ড্রেন নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের সমস্যা থেকে যেতে পারে। বিষয়টি শুরু থেকেই জানানো হয়েছিল।
সড়ক পাকাকরণ কাজের তদারকির দায়িত্বে থাকা উপসহকারী প্রকৌশলী কাজী মাহবুবুর রহমান মিলন বলেন, সেতুর উত্তর প্রান্তের শহরের মোড় এলাকায় সংযোগ সড়কের ধস পরিদর্শন করা হয়েছে। ঠিকাদারকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
উপজেলা প্রকৌশলী তপন কুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘টানা ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। আমরা খবর পেয়েই তাৎক্ষণিকভাবে ভাঙন রোধে বালুর বস্তা দিয়ে চারপাশ বেঁধে দিয়েছি। দুর্ঘটনা এড়াতে ওই স্থানে সার্বক্ষণিক লোক মোতায়েন করা হয়েছে। খুব দ্রুত স্থায়ীভাবে মেরামতের কাজ করা হবে।’
নির্মাণকাজে কোনো গাফিলতি ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কাজে কোনো গাফিলতি হয়নি। ইঁদুরের গর্ত দিয়ে পানি প্রবেশ করায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’
এ বিষয়ে গাইবান্ধা এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে মওলানা ভাসানী তিস্তা সেতুর সংযোগ সড়কের ওই অংশে গর্ত সৃষ্টি হয়ে ধস নেমেছে। এটি বড় কোনো কাঠামোগত সমস্যা নয়। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত স্থায়ী সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয়রা দ্রুত একটি স্বতন্ত্র তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ ও সংযোগ সড়কে স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানান। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা রোধে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণের জন্য আহ্বান করেন।