যশোরে ভারী বর্ষণে তলিয়ে গেছে আমন বীজতলা, কৃষকদের দুশ্চিন্তা
আমনের ভালো ফলনের আশা নিয়ে বীজতলা প্রস্তুত করেছিলেন যশোর সদর উপজেলার কৃষকরা। মাত্র এক দিনের ভারী বর্ষণ ও জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেছে শত শত কৃষকের আমন বীজতলা (পাতো)। পানিতে দীর্ঘ সময় ডুবে থাকায় তা পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে আমন রোপণ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার মুখে পড়েছেন তারা।
একদিকে নতুন করে বীজতলা তৈরির বাড়তি খরচের বোঝা, অন্যদিকে সারের আকাশচুম্বী দাম—সব মিলিয়ে মাঠেই মারা যাওয়ার উপক্রম হয়েছে স্থানীয় চাষিদের।
সরেজমিনে যশোর সদরের বিল হরিণার মাঠসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং কৃষকদের সাথে কথা বলে সংকটের এই চিত্র ফুটে উঠেছে।
বিলহরিণা এলাকার কৃষক আক্তার হোসেন জানান, তিনি পাঁচ বিঘা জমিতে আমন চাষের উদ্দেশে তিন কাঠা জমিতে গুটি স্বর্ণ ও বিরানি জাতের ধানের চারা (পাতো) ফেলেছিলেন।
তিনি বলেন, ‘পাতোর অবস্থা এখন পর্যন্ত কোনোমতে জেগে আছে। তবে, যাদের জমি নিচে, তাদের পাতো সব তলিয়ে গেছে। আবার বৃষ্টি হলে বিল হরিণা আর জাগবে না, আমরাও ধান রুতি (রোপন) করতে পারব না।’
প্রায় একই কথা বলেন কৃষক মোহাম্মদ আবুল কাশেম। তিনি বলেন, ‘গতকালও পাতোর ওপরে এক বিঘত পানি ছিল, আজও একই অবস্থা। পাতো বাঁচবে এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। নতুন করে বীজ, সার ও চাষের খরচ মেটানো আমাদের পক্ষে কঠিন। সরকার কোনো ভর্তুকি দেয় না। আগে যে ফসফেট সারের দাম ছিল ১৬ টাকা, এখন তা ৪০-৪২ টাকা। ইউরিয়া ৩০ টাকা। পাতো নষ্ট হয়ে গেলে আমরা ভুঁই (জমি) কীভাবে করব?’
কুড়ির মাঠ এলাকার কৃষক জাকির হোসেন বলেন, ‘হরিণার বিল তো তলায় গেছেই, মাঠে এখন মাজা ও গলা সমান পানি। সার-মাটির দিক থেকে কৃষকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। সারের চেয়ে ধানের মূল্য অনেক কম। যেখানে সারের বস্তা আগে ছিল ১২০০-১৪০০’ টাকা, এখন তা কিনতে হচ্ছে ১৬০০ থেকে ২০০০ হাজার টাকায়। কৃষক যদি না বাঁচে, তবে দেশ বাঁচবে কী করে?’
আশঙ্কার কথা জানান, ২৫ বিঘা জমির জন্য ১৫ কাঠা বীজতলা তৈরি করা কৃষক আজিজুর এবং সাত কেজি ধানের পাতো ফেলা ইব্রাহিম গাজী। তারা জানান, একদিনের বৃষ্টির পানিতেই সব তলিয়ে গেছে। পানি সরে গেলেও কাদা লেগে চারা নষ্ট হয়ে যাবে, তা দিয়ে আর রোপণ সম্ভব নয়। নতুন করে আবার বীজতলা তৈরি করতে হবে, যা মরার উপর খাঁড়ার ঘা।
কৃষক মোহাম্মদ হারুন খরচের হিসাব দিয়ে বলেন, ‘এক কাঠা জমি চাষ করতে ৪০ টাকা লাগে। তার ওপর বীজ ধানের মণ চার হাজার টাকা। সার ও নিজেদের পরিশ্রম মিলিয়ে মণ প্রতি ধান উৎপাদনে এমনিতেই প্রায় তিন হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। এবার আমাদের দেড় মণ বীজধান পুরোটাই নষ্ট। এই লোকসান সহ্য করার মতো নয়।’
কৃষকদের এই চরম সংকটের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে যশোর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘যশোর সদর উপজেলায় এবার আমন মৌসুমে ২৬ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। এর বিপরীতে বীজতলার টার্গেট ছিল ১৪৪০ হেক্টর, যার মধ্যে ৬৩০ হেক্টর অর্জিত হয়েছে। অতি বর্ষণের কারণে এর মধ্যে প্রায় ১৫৩ হেক্টর বীজতলা আক্রান্ত হয়েছে। আশার কথা হলো, বৃষ্টি কমে যাওয়ায় ইতিমধ্যে পানি সরে গিয়ে প্রায় ১২০ হেক্টর বীজতলা রিকভার (পুনরুদ্ধার) হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেসব এলাকার বীজতলা রক্ষা পেয়েছে, সেখানে কৃষকদের দ্রুত ছত্রাকনাশক স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। যাতে চারা পচে না যায়। আর যদি কোনো কৃষকের বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়ে থাকে, তবে কৃষি অফিস থেকে সরকারিভাবে তাদের বিনামূল্যে নতুন করে বীজ ধান সরবরাহ করা হবে। আমরা সর্বক্ষণ কৃষকদের পাশে আছি।’