১১ জুলাই ২০২৬, ১২:২৬

কক্সবাজারে বন্যায় তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি, ১৫০ গ্রামে জনজীবন স্থবির

বন্যায় কক্সবাজারের ১০ উপজেলার ৩৫ ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে  © টিডিসি

টানা ছয় দিনের অবিরাম ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে বন্যা পরিস্থিতির এখনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং জেলার বিস্তীর্ণ জনপদ এখনো পানির নিচে থাকায় লাখো মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১০টি উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত ১৫০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে তিন লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে চকরিয়া, পেকুয়া ও নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলায়। এসব এলাকায় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, মাছের ঘের এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়িঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিভিন্ন এলাকাও বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। শত শত বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, বাজার এবং গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় শিক্ষা কার্যক্রম, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। কোথাও কোথাও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। পাশাপাশি নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগ সমস্যার কারণে অনেক দুর্গত এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ু ও সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে আগামী আরও দুই দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ঘেরা এলাকাগুলোয় ভূমিধসের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় টানা বৃষ্টির কারণে সেখান থেকে নেমে আসা ঢলে মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছানোয় চকরিয়া ও পেকুয়ার বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। নতুন করে আরও কয়েকটি এলাকায় পানি প্রবেশ করায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।

জেলা প্রশাসন জানায়, বন্যাকবলিত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার বিভিন্ন স্থানে ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। দুর্গতদের জন্য সরকারিভাবে ২০০ মেট্রিক টন চাল, ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এসব সহায়তা দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবীরা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।

জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, উদ্ধার অভিযান, ত্রাণ বিতরণ এবং আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনার কার্যক্রম সার্বক্ষণিকভাবে অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকায় খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেক কৃষকের ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই কঠিন সময়ে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ অঞ্চল কার্যত জলাবদ্ধ জনপদে পরিণত হয়েছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে এবং বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাই দুর্গত মানুষের জন্য দ্রুত ত্রাণ সহায়তা বৃদ্ধি, নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য পাহাড়ধস মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে প্রশাসন।