রাতেই নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার শঙ্কায় পুরো বসতি, দূরত্ব মাত্র ২০ গজ
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের ভুষির ভিটা গ্রামে পূর্বে ডাম্পিং করা জিও ব্যাগ গভীর রাতে তিন স্থানে ধসে পড়েছে। এক স্থানে প্রায় ৫০ মিটার, অন্য স্থানে ৩০ মিটার এবং আরেক স্থানে ২০ মিটার করে মোট ১০০ মিটারের বেশি এলাকা হঠাৎ ডেবে যায়। এ যেন হঠাৎ ভেঙে পড়ল স্বপ্নের বুনিয়াদ।
ধসের মধ্যে দুটি স্থান সরাসরি সাধারণ মানুষের বসতিপূর্ণ এলাকা এবং অন্যটি একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে। এতে করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে পুরো গ্রামে। স্থানীয়রা বলছেন, ক্ষণে ক্ষণে মাটি ধসের শব্দ শুনে বুক কেঁপে উঠছে তাদের।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মান্নান জানান, বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাত দেড়টার দিকে বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায় তাদের। প্রথমে ভেবেছিলেন বজ্রপাত, কিন্তু বেরিয়েই দেখেন, নিজেদের বাড়ির পাশের জিও ব্যাগের বিশাল অংশ থৈ থৈ করছে পানিতে, আর মাটি ধসে নেমে গেছে নদীগর্ভে। তিনি বলেন, আমাদের ঘর থেকে মাত্র ২০ গজ দূরে ধস। বাড়ি নিয়ে পড়েছি দুশ্চিন্তায়, আজ রাতে কী হবে, আল্লাহ জানেন।
আরেক বাসিন্দা জুলেখা বেগমের বাড়ি ধসের একেবারে কিনারায়। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, স্বামী মারা গেছে, এই ঘরেই আমার আশ্রয়। এখন এই ঘরটাও কি নদী গ্রাস করবে? রাতে ঘুম আসছে না, বাচ্চাদের নিয়ে কোথায় যাব?
বিদ্যালয়ের পাশের ধস নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কটিয়ারভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক লিপি রাণী। তিনি বলেন, বিদ্যালয় ভবন থেকে মাত্র ৩০ মিটার দূরে জিও ব্যাগ ধসেছে। ছোট শিশুরা এখানে পড়তে আসে। যদি আরও ধস নামে, তাহলে স্কুল ভবনসহ শিশুদের জীবন ঝুঁকিতে পড়বে। ইতোমধ্যে অভিভাবকরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন।
ফুলছড়ি উপজেলা ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী। প্রতি বছর নদীভাঙনে নতুন নতুন এলাকা গ্রাস করে। তবে এবারের ধস যেন আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে শঙ্কা স্থানীয়দের। পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত বছর জরুরি ভিত্তিতে এ এলাকায় জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হয়েছিল নদীভাঙন রোধে। কিন্তু টানা বর্ষণ ও নদীর স্রোতের তীব্রতায় সেগুলো ঠিক রাখতে পারেনি নিজেদের অবস্থান।
স্থানীয় রেজাউল করিম জানান, আমরা আজ সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। ধস এতটাই ভয়াবহ যে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যদি জিও ব্যাগ দিয়ে পুনর্বাসন না করা হয়, তাহলে পুরো বসতি নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে। এলাকায় এখনও বৃষ্টি অব্যাহত আছে, যা পরিস্থিতি আরও জটিল করছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত জিও ব্যাগ পুনঃস্থাপন, ধসের মুখে পাইলিং এবং স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, আমরা বারবার বলেছি, এই এলাকায় নদীভাঙন তীব্র। কিন্তু প্রশাসন শুধু ক্ষণস্থায়ী ব্যবস্থা নেয়। এবার যদি স্থায়ী কিছু না করে, তাহলে আমরা সবাই উদ্বাস্তু হব।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, আমরা খবর পেয়েছি। দ্রুত একটি টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হচ্ছে। জিও ব্যাগ ধসের পরিমাণ জরিপ করে জরুরি ভিত্তিতে পুনরায় ডাম্পিংয়ের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় কাজে কিছু বিলম্ব হতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের কাছে অতিরিক্ত জিও ব্যাগ চেয়ে পাঠানো হবে।