০৯ জুলাই ২০২৬, ২১:৩৪

টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত খাগড়াছড়ি, তলিয়ে গেছে সড়ক-নিম্নাঞ্চল

হাঁটুপানি মাড়িয়ে চলাচল করছেন স্থানীয় লোকজন  © টিডিসি

টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ির জনজীবন। বৃষ্টিতে জেলার বিভিন্ন সড়ক ও নিম্নাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে, পানিবন্দী হয়ে পড়েছে শতাধিক পরিবার। একই সঙ্গে পাহাড় ধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

গত ৪ জুলাই শুরু হওয়া টানা বর্ষণে খাগড়াছড়ি সদর, মহালছড়ি, দীঘিনালা, পানছড়ি ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সদর উপজেলার মুসলিমপাড়া, আরামবাগ, মেহেদীবাগ, কমলছড়িসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে হাঁটুসমান পানি জমে বাড়িঘরে ঢুকে পড়েছে। অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র উঁচু স্থানে তুলে কোনোমতে দিন পার করছে।

মুসলিমপাড়ার বাসিন্দা রিনা আক্তার বলেন, ‘এবারের মতো এতদিন ধরে পানি ঘরে ছিল না। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে আছি। রান্না করা, ঘুমানো—সবই এখন সংগ্রাম।’

একই এলাকার মো. আব্দুল কাদের বলেন, ‘বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই। পানি আরও বাড়লে কোথায় যাব, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।’

শুধু বসতবাড়িই নয়, দুর্ভোগে পড়েছেন পথচারী ও কর্মজীবী মানুষও। মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি বাজার, স্লুইচগেটপাড়া এবং দীঘিনালা-লংগদু সড়কের আটারকছড়া এলাকায় সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিনের কাজে বের হওয়া মানুষকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।

অটোচালক মো. শাহজাহান বলেন, ‘সড়কে পানি থাকায় যাত্রী কমে গেছে। অনেক জায়গায় রিকশা চালানোই সম্ভব হয় না। সারা দিন পরিশ্রম করেও আগের অর্ধেক আয় হচ্ছে।’

অবিরাম বর্ষণে সদর উপজেলার শালবন, সবুজবাগ, আলুটিলাসহ কয়েকটি এলাকায় ছোট ছোট পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলো চরম উদ্বেগে রয়েছে।

শালবন এলাকার শাহিনা বেগম বলেন, ‘রাত হলেই ভয় লাগে। ভারী বৃষ্টি শুরু হলে মনে হয়, এই বুঝি পাহাড় ভেঙে পড়ল। পরিবার নিয়ে সারা রাত জেগে থাকতে হয়।’

সবুজবাগ এলাকার মো. আসলাম বলেন, "প্রশাসন নিরাপদ স্থানে যেতে বলেছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখেছি। বৃষ্টি বাড়লে আর দেরি করব না।"

পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র। সেখানে নিরাপদ আশ্রয়ের পাশাপাশি বিশুদ্ধ খাবার পানি ও প্রয়োজনীয় সেবার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে।

খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, ‘নদ-নদীর পানি এখনো বিপদসীমার নিচে রয়েছে। তবে আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। পাহাড় ধসের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলোতে নিয়মিত মাইকিং করা হচ্ছে। জেলা মোট ১৩৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। প্রয়োজন হলে দ্রুত মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হবে। প্রশাসনের সব বিভাগ মাঠে রয়েছে।’

খাগড়াছড়ির বিভিন্ন স্থানে বন্যায় প্লাবিত এলাকা, সড়ক ও পাহাড় ধস এলাকা পরিদর্শন করেছেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস মেহেদী, নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ ও পরিষদের সদস্যরা। তাঁরা কমলছড়ি, বটতলি, মেহেদীবাগসহ বিভিন্ন এলাকা এবং আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নেন।

পরিদর্শন শেষে শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন, ‘দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকা আমাদের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব। জেলা পরিষদ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে। কেউ যেন ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থান না করেন, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। মানুষের জীবন রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।’

এদিকে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে পানিবন্দী পরিবারগুলোর মধ্যে জরুরি খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারিয়া সুলতানার নেতৃত্বে পরিচালিত এ কার্যক্রমে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত জাবীন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অংশ নেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর আরও বৃষ্টির আভাস দেওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ বাড়ছে পাহাড়ি জনপদে। জেলা প্রশাসন পাহাড়ের পাদদেশ, ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল এবং নদী-ছড়ার তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে প্রশাসনের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করারও অনুরোধ জানানো হয়েছে।

প্রকৃতির নির্মম রূপের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এখন খাগড়াছড়ির মানুষের একটাই প্রত্যাশা,অবিরাম বর্ষণ থামুক, পানি নামুক, স্বাভাবিক ছন্দে ফিরুক পাহাড়ের জীবন।