বৃষ্টি থামার নাম নেই, টানা বর্ষণে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম
টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও পানিবন্দী মানুষ, আবার কোথাও পাহাড়ধসের শঙ্কায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে বাসিন্দাদের। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী শুক্রবার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
গত কয়েক দিন ধরে চট্টগ্রামে থেমে থেমে বৃষ্টি হলেও মঙ্গলবার রাত থেকে বুধবার পর্যন্ত টানা ভারী বর্ষণ হয়েছে। এতে নগরের নিচু এলাকার বিভিন্ন সড়ক ও বসতবাড়িতে পানি জমে যায়। কয়েক দিন ধরে সূর্যের দেখা নেই। সড়কে যানবাহন চলাচল মোটামুটি স্বাভাবিক থাকলেও মানুষের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলক কম। অনেক এলাকায় পানি নামতে দেরি হওয়ায় বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের মধ্যে পাহাড়ধসের আশঙ্কাও বেড়েছে।
নগরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, বিমানবন্দরগামী যাত্রী ও দিনমজুরেরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে অনেক শিক্ষার্থীকে পরীক্ষাকেন্দ্রে যেতে হয়েছে। তবে ভারী বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন সব জেলার বুধবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে দুর্যোগকে পুঁজি করে নগরের বিভিন্ন রুটে গণপরিবহনে দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ পর্যন্ত অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যাত্রীদের অভিযোগ, বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার অজুহাতে অনেক পরিবহন চালক অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেছেন।
আরও পড়ুন: দেশের ১৯ জেলায় ৬০ কিমি বেগে ঝড়ের শঙ্কা
টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। নগরের অন্তত ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে এখনো সহস্রাধিক পরিবার ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। এরই মধ্যে মঙ্গলবার চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা, রাঙামাটির বাঘাইছড়ি ও কক্সবাজারে পৃথক দেয়াল ও পাহাড়ধসের ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনার পর পাহাড়ঘেঁষা বসতিগুলো নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ছয়টা থেকে বুধবার সকাল ছয়টা পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। অধিদপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বুধবার থেকে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। বৃহস্পতিবার মাঝেমধ্যে ভারী বৃষ্টি, শুক্রবার কখনো কখনো ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এরপরও কয়েক দিন থেমে থেমে বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।
যেসব এলাকায় জলজট
সরেজমিনে দেখা গেছে, মঙ্গলবার রাতের ভারী বৃষ্টির পরও বুধবার নগরের বেশ কয়েকটি এলাকায় পানি জমে ছিল। এর মধ্যে পতেঙ্গার মাইজপাড়া, ফুলছড়ি পাড়া, ডেইল পাড়া, কাটগড় মুসলিমাবাদ, কমিশনার গলি, স্টিল মিলস নেতারগলি, সিমেন্ট ক্রসিং, আকমল আলী রোড, খালপাড়, ঈমান মিস্ত্রি রোড, নিশ্চিন্তাপাড়া, হালিশহরের ভেন্ডাপাড়া, আগ্রাবাদ সিডিএ এলাকা, চকবাজার, চান্দগাঁও, প্রবর্তক মোড়সংলগ্ন এলাকা, বাকলিয়া, বায়েজিদ ও খাতুনগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। কোথাও কোথাও বাসাবাড়িতেও পানি ঢুকে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টানা বৃষ্টিতে নিচু এলাকার পানি নামতে না পারায় অনেকের বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। রান্নাঘরে পানি ওঠায় অনেক পরিবার রান্না করতে পারছে না। বাধ্য হয়ে তারা শুকনো খাবারের ওপর নির্ভর করছে। একই সঙ্গে বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা।
তবে বৃষ্টি কমে আসার পর অধিকাংশ এলাকার পানি দ্রুত নেমে গেছে বলে দাবি করেছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, খাল ও নালা নিয়মিত পরিষ্কার রাখার ফলে টানা বৃষ্টি হলেও অধিকাংশ এলাকার পানি আগের তুলনায় দ্রুত সরে যাচ্ছে।
যা বলছে আবহাওয়া অফিস
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক স্বাক্ষরিত সর্বশেষ বিশেষ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, উত্তর-পশ্চিম মধ্যপ্রদেশ ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত সুস্পষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় বায়ুচাপের তারতম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর, বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর দিয়ে ঝোড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।
এ কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখন বর্ষা মৌসুমের মধ্যভাগ। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র বাতাসের কারণে ঘন ঘন মেঘের সৃষ্টি হচ্ছে এবং সেখান থেকেই দফায় দফায় বৃষ্টি হচ্ছে। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় আগামী কয়েক দিন আবহাওয়ার উল্লেখযোগ্য উন্নতির সম্ভাবনা নেই। তাই চট্টগ্রামবাসীকে আরও কয়েক দিন বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগের জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।