০৭ জুলাই ২০২৬, ১৭:০৮

চট্টগ্রামে মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই পাহাড়ে বাস সহস্রাধিক পরিবারের, মাইকিংয়ে সরছেন না কেউ

জেলা প্রশাসনের মাইকিং ও বারবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও পাহাড় ছাড়তে নারাজ বসবাসকারীরা  © টিডিসি

চট্টগ্রামে প্রতিবছরের মতো এবারও বর্ষা আসতেই শুরু হয়েছে পাহাড় ধসের আতঙ্ক। আর এই আতঙ্কের মধ্যেই বন্দরনগরীর ২৬টি পাহাড়ে চরম মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে অন্তত সহস্রাধিক পরিবার। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড় ধসে প্রাণহানির শঙ্কা দেখা দিলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং আর সচেতনতামূলক তৎপরতা চোখে পড়ে, তবে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বুক কাঁপানো ধসের শঙ্কার চেয়েও উচ্ছেদ না হওয়ার জেদ যেন বেশি কাজ করছে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের মধ্যে। জেলা প্রশাসনের মাইকিং ও বারবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও পাহাড় ছাড়তে নারাজ এই বাসিন্দারা।

সরেজমিনে বায়েজিদের রৌফাবাদ মিয়া পাহাড়ে গিয়ে দেখা যায় এক ভয়ানক চিত্র। পাহাড়টির ভাঁজে ভাঁজে ঝুঁকিপূর্ণভাবে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অবৈধ বসতঘর। নিয়মিত ও নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে সামান্য বৃষ্টি শুরু হতেই পাহাড় বেয়ে নেমে আসছে কর্দমাক্ত পানির ঢল, যা দূর থেকে দেখতে অনেকটা পাহাড়ি ঝর্ণার মতো মনে হলেও আসলে তা এক একটি মরণফাঁদ।

গত দু-তিন দিনের বিরামহীন বর্ষণে পাহাড় ধসের আশঙ্কা কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। জেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার জন্য অনবরত মাইকিং করছে। তবে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাসিন্দাদের অজুহাতের শেষ নেই।

সেখানে বসবাসকারী এক স্থানীয় বাসিন্দা অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, ‘কি করব আমাদের জায়গা সম্পদ নেই। আমরাও এখন বলা যায় অসহায়ের মতই তো আছি। কি করব কোথায় যাব, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে আমরা কোথায় থাকব।’

আবার উল্টো সুরও শোনা গেল অন্য এক বাসিন্দার মুখে। এক প্রকার নির্বিকার থেকে তিনি বলেন, ‘এত দিন যেহেতু আছি আমাদের কখনো এ রকম লাগেনি ঝুঁকিপূর্ণ। কিংবা আমাদের এরকম বর্ষাকালটা প্রথমবার দেখা যাচ্ছে আরকি।’

জেলা প্রশাসনের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগরীর ঝুঁকিপূর্ণ ২৬টি পাহাড়ে এক হাজারের বেশি পরিবার অবৈধভাবে বসবাস করছে। বর্ষা এলেই পাহাড় ধস ও প্রাণহানি চট্টগ্রামের একটি নিয়মিত বার্ষিক ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, পাহাড় কেটে তৈরি করা এই সম্পূর্ণ অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বসতিগুলোতে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসসহ সব ধরনের ইউটিলিটি বা নাগরিক সুবিধা বহাল তবিয়তে রয়েছে। মূলত এই সুযোগ-সুবিধার কারণেই বাসিন্দারা পাহাড় ছাড়তে চান না।

অভিযোগ রয়েছে, বৃষ্টি শুরু হলে প্রশাসনের উচ্ছেদ তৎপরতা ও মাইকিংয়ের তোড়জোড় দেখা গেলেও বছরের বাকি সময়টা এ বিষয়ে কোনো কার্যকর নজরদারি থাকে না।

পাহাড় কাটা রোধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবৈধ বসতি বন্ধে ‘পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটি’ এ পর্যন্ত ৩০টির বেশি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এখন পর্যন্ত তার একটিও বাস্তবায়ন হয়নি। প্রশাসনের কাছে পাহাড় দখলদারদের তালিকা থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বড় অভিযান পরিচালিত হয়নি। এমনকি গত বছরের সভায় গৃহীত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং সব ধরনের ইউটিলিটি (গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি) সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার যে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তাও শেষ পর্যন্ত ফাইলবন্দিই থেকে গেছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্লাবন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘এখানে যে ইউটিলিটিগুলো দেওয়া হয়—গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, এগুলো নিয়েও একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। আশা করি এবার পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে আরও জোরদার কোনো সিদ্ধান্ত আমরা পাব।’ 

পরিবেশবাদীরা বলছেন, শুধু বর্ষা মৌসুমের মাইকিং কিংবা দায়সারা আশ্রয়কেন্দ্র খোলার সাময়িক নাটক বন্ধ করে পাহাড়ের ইউটিলিটি সংযোগ স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন এবং প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা না নিলে চট্টগ্রামের এই পাহাড় ধসের মরণখেলা কোনো দিনই বন্ধ হবে না।