আনোয়ারায় রাত থেকেই নেই বিদ্যুৎ, বিপাকে এইচএসসি পরীক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ
টানা কয়েক দিনের মুষলধারে বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার জনজীবন পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গতকাল সোমবার (৬ জুলাই) দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার পর থেকে উপজেলার একটি বড় অংশ বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার্থীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রাত থেকেই উপজেলা সদর, চাতরী, বন্দর, বরুমচড়া, হাইলধরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বৃষ্টির কারণে উপজেলার নিচু এলাকাগুলো জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। ভারী বর্ষণে উপজেলা সদর ও চাতরী চৌমুহনী বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলজট। পানি ঢুকে পড়েছে খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফুলকলি’, বিভিন্ন ফার্মেসীসহ নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে।
চলতি এইচএসসি পরীক্ষার এ সময়ে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ-বিভ্রাট পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাতরী এলাকার এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাসমিয়া জাহান বলেন, ‘এমনিতেই বৃষ্টির কারণে কাল কেন্দ্রে যাওয়া নিয়ে টেনশনে আছি। গতকালও বৃষ্টির জন্য কেন্দ্রে যেতে বেগ পেতে হয়েছে। তার ওপর রাত থেকে বিদ্যুৎ নেই। আইপিএস-ও ব্যাকআপ দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সকালে মোমবাতি জ্বালিয়ে কোনোমতে রিভিশন দিয়েছি। অন্ধকারে পড়াশোনায় একদম মনোযোগ দেওয়া যাচ্ছে না। আমাদের পরীক্ষার দিনগুলোতে অন্তত নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দেওয়া উচিত ছিল।’
পরীক্ষার্থীদের পাশাপাশি দুর্ভোগে পড়েছে স্কুলগামী ছোট শিক্ষার্থীরাও। সিইউএফএল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহী বলে, ‘সকাল থেকে এত বৃষ্টি যে ছাতা নিয়েও গা ভিজে যাচ্ছে। আমাদের অর্ধবার্ষিকী পরীক্ষা চলছে। যে করেই হোক স্কুলে যেতে হবে। রাস্তায় পানি জমে থাকায় স্কুলে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছে। তার ওপর রাতে কারেন্ট না থাকায় ঘুমাতেও পারিনি, সকালে পড়তেও পারিনি।’
টানা বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন দিনমজুর ও গণপরিবহন চালকেরা। মেঘাচ্ছন্ন আকাশে সকালের আলো যেন ঢাকা পড়েছে ঘুটঘুটে অন্ধকারে। ফলে সকালের দিকেও অধিকাংশ যানবাহনকে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করতে দেখা গেছে।
জয়কালী বাজার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাচালক জয়নাল বলেন, ‘সকাল থেকে বৃষ্টির কারণে রাস্তায় মানুষ একদম কম। ভিজা ভিজা এক-দুইটা ট্রিপ মারলেও কাপুনি ধরে যাচ্ছে। আয়-রোজগার নাই, আজ কপালে কী আছে আল্লাহ জানে।’
সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. আকিব বলেন, ‘সকালে মনে হচ্ছিল যেন গভীর রাত। অন্ধকারের কারণে হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। রাস্তায় পানি জমে থাকায় খানাখন্দ বোঝা যাচ্ছে না, গাড়ি যেকোনো সময় উল্টে যাওয়ার ঝুঁকি আছে। চাতরী বাজারে পানি উঠে যাওয়ায় চলাচলে কষ্ট হচ্ছে।’
বিদ্যুৎ না থাকায় শুধু পরীক্ষার্থীরাই নয়, সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। আনোয়ারা সদরের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, ‘রাত থেকে কারেন্ট নাই, মোবাইলের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ায় কারও সাথে যোগাযোগও করতে পারছি না। মোটর চালাতে না পারায় সকাল থেকে বাসায় পানির জন্য হাহাকার লেগেছে। বৃষ্টির কারণে দোকানপাটও খুলতে পারছি না, তার ওপর এই লোডশেডিং আমাদের পঙ্গু করে দিয়েছে।’
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তাদের দাবি, ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বর্ষণের কারণে বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুতের লাইনের ওপর গাছের ডালপালা ভেঙে পড়েছে। কিছু জায়গায় তার ছিঁড়ে যাওয়ার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
এবিষয়ে আনোয়ারা জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মোরশেদুল আলম চৌধুরীকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
টানা বৃষ্টি আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। স্থানীয়রা বলছেন, দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও জলজট নিরসন করা না হলে উপজেলার সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও চরমে পৌঁছাবে।