উপকূলের শিশুদের বদলে দিচ্ছে ‘ক্লাইমেট স্মার্ট এডুকেশন’
জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় জনপদে যেখানে দারিদ্র্য ও শিক্ষাবঞ্চনাই ছিল শিশুদের নিত্যসঙ্গী, সেখানে নীরবে বদলে যাচ্ছে ভবিষ্যতের গল্প। বাগেরহাটের শরণখোলায় ‘ক্লাইমেট স্মার্ট এডুকেশন’ উদ্যোগের মাধ্যমে খেলাধুলা, গান ও আনন্দের পরিবেশে ইংরেজি, গণিত ও জীবনদক্ষতা শিখে আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে শত শত শিশু। এই উদ্যোগ শুধু তাদের ভাষা শেখাচ্ছে না, দেখাচ্ছে নতুন স্বপ্নও। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলে এই পরিবর্তন এনে দিয়েছে ক্যাপস ক্লাইমেট অ্যাডাপটেশন প্ল্যান সোসাইটির (সিএপিএস) বাস্তবায়িত ব্যতিক্রমধর্মী শিক্ষা উদ্যোগ ‘ক্লাইমেট স্মার্ট এডুকেশন’।
এই প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে শরণখোলা উপজেলায় পরিচালিত হচ্ছে ৫৪টি কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার (সিএলসি)। এসব কেন্দ্রে ৩৭৫ জন শিক্ষক ২ হাজারের বেশি শিশুকে পাঠদান করছেন।
ক্যাপস জানায়, প্রতি ৫০টি পরিবারকে কেন্দ্র করে একটি কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রেই পরিচালিত হচ্ছে কমিউনিটি লার্নিং সেন্টার, যা মূল বিদ্যালয়ের পরিপূরক শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। এখানকার সব শিক্ষার্থীই নিজ নিজ বিদ্যালয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করে। স্কুল শুরুর আগে বা পরে এবং শুক্র ও শনিবার এসব কেন্দ্রে পাঠদান করা হয়।
খেলাধুলা, গান, ছড়া ও কথোপকথনের মাধ্যমে শিশুদের শেখানো হয় ইংরেজি, গণিত ও পরিবেশ সচেতনতা। ইংরেজি শেখানো হয় আন্তর্জাতিক ইন্টারন্যাশনাল ফোনিক্স (আইপিএইচ) পদ্ধতিতে, যাতে তারা দ্রুত সঠিক উচ্চারণ ও বাক্যগঠন আয়ত্ত করতে পারে। পাশাপাশি মাইন্ড ম্যাথ পদ্ধতির মাধ্যমে শিশুদের মানসিক বিকাশ ও মনোযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ ছাড়া হতদরিদ্র জেলে পরিবারের শিশুদের বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার ও শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ করা হয়।
শিক্ষার্থী রাইসা হাসান (৮) বলে, ‘আগে ইংরেজি পড়তে ভয় লাগত। এখন স্যার খেলতে খেলতে শেখান। আমি এখন নিজে ইংরেজি বই পড়তে পারি, ইংরেজিতে কথাও বলতে পারি।’
আরেক শিক্ষার্থী সাব্বির শেখ (১০) বলে, ‘আমি এখন ইংরেজিতে বলতে পারি, I want to be a teacher! সবাই হাততালি দেয়, খুব ভালো লাগে।’
রাইসার মা হাসিনা বেগম বলেন, ‘আগে আমাদের এলাকায় সন্তানরা পড়াশোনায় আগ্রহ দেখাত না। এখন ওরা আনন্দ নিয়ে ক্লাসে যায়, ইংরেজিতে কথা বলে। মেয়ের ইংরেজি বলা শুনে আমার খুব ভালো লাগে।’
অভিভাবক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই সেন্টার না থাকলে আমাদের ছেলেমেয়েরা হয়তো পড়াশোনা ছেড়ে দিত। এখন তারা আত্মবিশ্বাসী, ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে।’
কমিউনিটি শিক্ষক লায়লা পারভিন বলেন, ‘ছয় মাসের প্রশিক্ষণ ছাড়া কেউ এখানে ক্লাস নেন না। আমরা শিশুদের মনস্তত্ত্ব বুঝে পাঠদান করি, তাই তারা আগ্রহ নিয়ে ক্লাসে অংশগ্রহণ করে।’
আরেক শিক্ষক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘শিশুরা শুধু ইংরেজিই শেখে না, তারা পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পানির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কেও শিক্ষা পায়।’
সেন্টারের প্রধান সমন্বয়ক মনিরুজ্জামান হাওলাদার বলেন, ‘আমরা ঝরে পড়া, অনাগ্রসর, শিশুশ্রমে যুক্ত এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন—এই চার শ্রেণির শিশুদের নিয়ে কাজ করি। আমাদের লক্ষ্য, তাদের শেখার সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাসী ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।’
ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী পরিচালক মু. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আমরা চাই উপকূলের শিশুরা শুধু জলবায়ুর প্রভাব সহ্য করবে না, বরং অভিযোজনের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবে। ইংরেজি দক্ষতা ও মানসিক বিকাশের এই উদ্যোগ সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নেরই একটি অংশ।’