২৯ জুন ২০২৬, ১৩:১৭

যশোরের দুই মহাসড়কে বেপরোয়া বাস চলাচল, বাড়ছে দুর্ঘটনা

খুলনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কের  © সংগৃহীত

যশোর-খুলনা-কুষ্টিয়া এবং যশোর-বেনাপোল-সাতক্ষীরা মহাসড়কে চলাচলকারী লোকাল পরিবহনের চালকদের বিরুদ্ধে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যাত্রীদের দাবি, মালিক সমিতির নির্ধারিত সময়ের চাপ, বিভিন্ন ছোট স্ট্যান্ডে অযথা বিলম্ব এবং পরে সেই সময় পুষিয়ে নেওয়ার প্রবণতাই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এসব মহাসড়কে ছোট-বড় দুর্ঘটনা যেন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, যশোর-কুষ্টিয়া-খুলনা রুটে প্রতিদিন শতাধিক গড়াই-রূপসা পরিবহন চলাচল করে। সকাল ৬টা ২১ মিনিট থেকে রাত ৭টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত প্রতি ১০ মিনিট পরপর বাস ছাড়ে। মালিক সমিতির নির্ধারিত সময় অনুযায়ী যশোর থেকে কুষ্টিয়া যেতে ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট এবং খুলনা থেকে কুষ্টিয়া যেতে ৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের বেশি লাগলে প্রতি মিনিটে ৬০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, পথে অসংখ্য ছোট স্ট্যান্ডে দুই থেকে পাঁচ মিনিট করে সময় নষ্ট হলেও শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে চালকরা অতিরিক্ত গতিতে বাস চালাতে বাধ্য হন। এতে যাত্রীদের নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে এ মহাসড়কে একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটেছে। কয়েক দিন আগে যশোর-খুলনা মহাসড়কের রূপদিয়ার চাউলিয়ার মোড়ে বাস দুর্ঘটনায় চারজন নিহত হন। এর আগে ১৭ জুন অভয়নগরের বাজিয়াডাঙ্গায় একটি গড়াই পরিবহন উল্টে তিনজনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় আহত যশোর সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আজিজুর রহমান এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

অন্যদিকে যশোর-বেনাপোল-সাতক্ষীরা মহাসড়কে চারটি মালিক সমিতির অধীনে প্রায় ৪০০ লোকাল বাস চলাচল করে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রতি সাত মিনিট পরপর বাস ছাড়ে। যশোর থেকে বেনাপোল পৌঁছানোর নির্ধারিত সময় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট। সময়সীমা অতিক্রম করলে প্রতি মিনিটে ১০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।

যাত্রীদের অভিযোগ, স্ট্যান্ডে বিলম্বের কারণে পরে চালকরা মহাসড়কে প্রতিযোগিতামূলক গতিতে বাস চালান, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে ঝিকরগাছার কৃত্তিপুর মোড়ে স্থানীয় যাত্রীরা দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেতে দোয়া মাহফিলও আয়োজন করেছেন।

যশোরের আদর্শ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল ইসলাম বলেন, তিনি প্রতি সপ্তাহে গড়াই বা রূপসা পরিবহনে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন। তাঁর ভাষায়, গাড়িগুলো অতিরিক্ত গতিতে চলে। যাত্রীদের জীবন হাতে নিয়ে চলতে হয়। কুষ্টিয়া-খুলনা মহাসড়কের অনেক অংশই চলাচলের অনুপযোগী। এর মধ্যেও চালকরা দ্রুতগতিতে বাস চালান। বিভিন্ন ছোট স্ট্যান্ডে অপ্রয়োজনীয় সময় নষ্ট না করলে স্বাভাবিক গতিতেই নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব।

যশোর সরকারি এম এম কলেজের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী মুকুল হোসেন বলেন, যশোর-বেনাপোল রুটের অনেক বাসের অবস্থা নাজুক। তারপরও অতিরিক্ত গতিতে চালানো হয়। স্ট্যান্ড থেকে দেরিতে ছেড়ে পরে সেই সময় পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা থেকেই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

যশোর জেলা পরিবহন সংস্থা শ্রমিক ইউনিয়নের (২২৭) সাধারণ সম্পাদক মোর্ত্তজা হোসেন বলেন, খুলনা-কুষ্টিয়া সড়কে গড়াই-রূপসা ব্যানারে তিনটি মালিক সমিতির বাস চলাচল করে। রাস্তার বেহাল অবস্থা, রেলক্রসিং, হাটবাজার এবং যানজটের কারণে নির্ধারিত সময়ে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি বলেন, প্রতিটি স্ট্যান্ড থেকে সাত মিনিটের পরিবর্তে ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরপর বাস ছাড়ার ব্যবস্থা করলে চালকদের ওপর চাপ কমবে এবং দুর্ঘটনাও হ্রাস পাবে।

এ বিষয়ে বারোবাজার হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস বলেন, খুলনা-কুষ্টিয়া মহাসড়কে বাসের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার হওয়া উচিত। রাস্তার অবস্থা অনুযায়ী অনেক স্থানে আরও কম গতিতে চলতে হয়। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালাতে দেখা গেলে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী মামলা ও জরিমানা করা হচ্ছে।

নাভারন হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোপাল কর্মকার বলেন, হাইওয়ে পুলিশের কাছে স্পিড গান রয়েছে। অতিরিক্ত গতিতে চলাচলকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করা হচ্ছে। যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চালকদের দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বাস্তবসম্মত সময়সূচি নির্ধারণ, স্ট্যান্ড ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, নিয়মিত গতি নিয়ন্ত্রণ এবং মালিক-শ্রমিক-প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমানো কঠিন হবে।