বাংলাদেশি এক চিকিৎসকের ফিলিস্তিনের গাজায় যাওয়ার গল্প
যুদ্ধ, ধ্বংসস্তূপ আর মৃত্যুর শঙ্কায় ঘেরা ফিলিস্তিনের গাজায় পৌঁছানোর রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশি চিকিৎসক রাঈক রিদওয়ান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি সীমান্ত পেরিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডে যাওয়ার পুরো যাত্রাপথ, নানা চ্যালেঞ্জ এবং নিজের অনুভূতির কথা বর্ণনা করেছেন। পাঠকদের জন্য তার সেই পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো।
গত জানুয়ারি মাসে Instagram-এ এক আরব-আমেরিকান ডাক্তারের পোস্ট দেখি, যে গাজায় তার অভিজ্ঞতা নিয়ে পোস্ট করেছে। সেও ইমার্জেন্সি মেডিসিনের, তাই তাকে আমি মেসেজ দেই। সে এক এনজিওর নাম বলল, যেটা আগে শুনি নাই—ছোট এক এনজিও, কিছু ডাক্তাররাই চালায়। গুগল করে পেলাম, মেসেজ দিলাম।
আমার সার্টিফিকেট, ফেলোশিপ সার্টিফিকেট, পাসপোর্ট ডিটেইলসসহ বেশ কিছু জিনিস জমা দিতে বলল। স্পেশালিস্ট না হলে জুনিয়র ডাক্তার তারা নেবে না বলল। ফেব্রুয়ারির শুরুতেই মেসেজ দিয়ে বলে যে মার্চের ১৯ তারিখ যেতে পারব কিনা। রাজি হয়ে গেলাম। এ কারণেই ফেসবুক রোজায় অফ রেখেছিলাম। এক মাস আমার পরিচিত ৩ জনের সঙ্গে কথা বলেছি, যারা গিয়েছে আগে (ওই Insta ডাক্তারকেও নক করেছিলাম)।
সব প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করি। এমন সময় ঝামেলা বাঁধে এক জায়গায়—জর্ডানের ভিসা। ১৬ বার রিজেকশন খাওয়ার পর শেষমেশ পেয়েছিলাম। কিন্তু ততদিনে শুরু হয় আরেক ঝামেলা—আমেরিকা-ইসরাইলের ইরানের ওপর আক্রমণ ও যুদ্ধ। এ কারণে কয়েকদিন গাজায় ক্রসিং বন্ধ ছিল, অনেক ডাক্তার ভিতরে আটকে যায়। এনজিও থেকে বলল, সব অফ করে দিচ্ছি কয়েক সপ্তাহ, কারণ ডাক্তারদের সেফটির ব্যাপার। সব ছুটি মাটিতে। ফ্লাইটও সব ওলটপালট, তাই দেশে এসে ঈদ করব—এমন অবস্থাও নাই।
এনজিওকে বললাম যে আমি জুনেও শিডিউল ক্লিয়ার করছি। জর্ডানের ভিসা জুন পর্যন্ত ভ্যালিড, আর এতবার এত জ্বালা দিয়েছে যে থাকতে থাকতেই যেতে চাই।
সাইন আপ করেছি মানে কোনো গ্যারান্টি নাই। আমাদের নাম প্রথমে সাবমিট করা হবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কাছে। এর পর তারা ভেরিফাই করে পাঠাবে ইসরাইলি এজেন্সি COGAT-এর কাছে। কোগাট ইচ্ছা করে তাদের পারমিট পাঠাবে যাওয়ার জাস্ট ১২ ঘণ্টা আগে। জর্ডান পর্যন্ত গিয়েও শুনতে হতে পারে যে পারমিট রিফিউজ করা হতে পারে। এই রিস্ক নিয়েই গেলাম।
উদ্ভট নিয়ম দিল কিছু—একটা ফোন, একটা ল্যাপটপ ছাড়া অন্য কোনো ইলেকট্রনিক্স নেওয়া যাবে না, এমনকি ক্যামেরাও না। কোনো গিফট নেওয়া যাবে না, কোনো মেডিকেল ইকুইপমেন্টও না। "অবৈধ" কিছু ধরা পড়লে ফিরিয়ে দেওয়া হবে বর্ডার থেকে।
৭ জুন লন্ডন থেকে ইস্তানবুল গিয়ে জর্ডানের ফ্লাইট কানেক্টিং করতে যাব, এমন সময় একদম গেট থেকে বলল যে ফ্লাইট ক্যানসেল। ইরান আবার ইসরাইলে হামলা করেছে, তাই জর্ডানের এয়ারস্পেস অফ। এখন সমস্যা হলো ৩টা—১। আমার জর্ডানে ৮ তারিখের মধ্যে যেতে হবে, তারা ফ্লাইট রিশিডিউল করে করল ৯ জুন। ২। ৮ তারিখের ফ্লাইটগুলো যাবে কি যাবে না, শিওর না। ৩। জর্ডানিয়ান এয়ারলাইন্সের ২ ঘণ্টার ফ্লাইটের দাম এখন ৯০০ ডলার! মনে মনে ভাবলাম—আমি যেতে নিলেই এদের এত মারামারি লাগানো লাগে কেন?
রাতে এয়ারলাইন্সের প্রসিডিউর, তুরস্কের ভিসা ও সব কিছু করার সময় ভাবছিলাম—এত হ্যাসেল কি আসলে নেওয়া দরকার? বুঝেন তো, শয়তান মনে কিছু ডাউট ঢুকায় দেয়।
এয়ারলাইন্স থেকে একটা হোটেল দিয়েছিল। রাতে তেমন ঘুম হয়নাই, কারণ ভোরবেলা ঘুম ভাঙিয়ে এনজিওর চিফ ডাক্তার কল দিয়ে বলল যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) থেকে কনফার্ম করেছে যে আগামিকাল ক্রসিং হবে—"যেভাবেই হোক চলে যাও আম্মান"। উঠে একটু পরপর চেক করছি ফ্লাইট যাচ্ছে কিনা। যায় না, যায় না করতে করতে দুপুর ১টার দিকে একটা ফ্লাইট ইস্তানবুল থেকে আম্মান যায়—আমাদের আরেক ডাক্তার ওই ফ্লাইটে ছিল। কিডনি বিক্রি করা দামে নিয়ে ফেললাম টিকিট—ওই ফ্লাইটের লাস্ট টিকিট ছিল আমারটা!
রাত ৯টার ফ্লাইটে উঠব। ফ্লাইটে চেক-ইন করার আগেই মেসেজ আসল যে আমাকে অ্যাপ্রুভ করা হয়েছে। মাঝে মাঝে ভাবি যে এভাবে ঢোকার আগের দিন রিজেক্ট করলে কেমনটা লাগত। আমাদের এনজিওর একজনকে রিজেক্ট করা হয়েছিল। নিজ গন্তব্য থেকে এত দূর এসে এভাবে "না" শোনাটা আসলেই কষ্টকর।
আম্মানে পৌঁছাই রাতে। বের হতে হতে রাত ২টা, সকাল ৬টা থেকে আবার শুরু লম্বা জার্নি। এটা ২১০তম রোটেশন আম্মান থেকে, যেটা জাতিসংঘ কো-অর্ডিনেট করছিল। আগে মিসরের রাফাহ ক্রসিং দিয়ে আসা যেত, এখন এই এক রুট—জর্ডান থেকে।
প্রথমে আম্মান থেকে এক বাস নিয়ে যাবে জর্ডান-পশ্চিম তীর সীমান্তে। যদিও এই সীমান্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য, এটার কন্ট্রোল ইসরাইলিদের হাতে। জর্ডানের ইমিগ্রেশন লাগল এক ঘণ্টা, তারপর ইসরাইলি চেকপয়েন্ট। প্রথমে এক ধাপে ব্যাগ চেক করল। অফিসার বাংলাদেশকে ইন্ডিয়া ভেবে প্রথমে অনেক খাতির করল। আমার অতি জাতীয়তাবাদী ইগো রেগে গিয়ে বলল, না এটা ভারত না, এটা বাংলাদেশ। লোকটার খাতির একটু কমল। তারপর জিজ্ঞাসা করল আমি কি ট্যুরিস্ট হিসেবে ইসরাইল যাব? বললাম, না, মেডিকেল মিশনে। খাতির আরও কমে আমার পাসপোর্ট ফিরিয়ে দিল। প্রথমে ভারতীয় বললেই হয়তো ভালো হতো। এর পর আমাদের পুরো বাসের ৪৫ জনের পাসপোর্ট জমা দেওয়া হলো এক কোগাট অফিসারের কাছে। আমরা বসে থাকলাম লাগেজের জন্য।
ধীরে ধীরে অনেক চেকের পর লাগেজ ফিরে আসল। বসিয়ে রাখা হলো আমাদের প্রায় আড়াই-তিন ঘণ্টা। শেষমেশ সবার পারমিট আসল। অন্যান্য সময় অনেক প্রশ্ন করা হলেও এবার অতটা করেনি। এর পর আরেকবার ব্যাগ চেক। অনেকের ব্যাগ দুইবার চেক করেছে, এমনকি অনেকের খুলেও দেখেছে। তাও আরেকবার এক্স-রে মেশিনে। তারপর কুকুর দিয়ে। যার ব্যাগ একটা এক্স-রে মেশিন, একটা MRI, আবার হাত দিয়ে খুলে দেখা হয়েছে, আবার কুকুরও!
অপরদিকে যাওয়ার পর জাতিসংঘের এক রিপ্রেজেন্টেটিভ আমাদের রিসিভ করল—নতুন এক বাসে এবার। বলল, বাথরুম করে নাও, ৩-৪ ঘণ্টায় আর নাই। ইসরাইল ও পশ্চিম তীরের ভূমির ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় কোনো কারণেই বাস থামতে পারবে না। একদম জীবন-মৃত্যুর লড়াই যদি না হয়, তা ছাড়া। আমাদের বাসের সামনে একটা গাড়ি ও পিছনে আরেকটা গাড়ি থাকবে আইডিএফ-এর, যাতে আমাদের কোনো ডাম-বাম করার সুযোগ না থাকে।
৩ ঘণ্টার লম্বা জার্নিতে আশপাশের লোকদের সাথেও কথা হলো। বাসে আমরা ৪ জন ডাক্তার। অন্যরা লজিস্টিশিয়ান, সিকিউরিটি এক্সপার্ট, নিউট্রিশন এক্সপার্ট, স্যানিটেশন এক্সপার্ট, এমনকি জাতিসংঘের গাজা অফিসের ভিপিও ছিল আমাদের সঙ্গে।
দীর্ঘ সময় পার হয়ে এসে পৌঁছাই কেরেম শালোম বা কারিম আবু সালেম ক্রসিংয়ে। এটা একটা ত্রিমুখী সীমান্ত, যেখানে মিসর-ইসরাইল-গাজা এসে লাগে। গাজার একদম দক্ষিণ প্রান্তে এনে ঢুকতে দেওয়া হয় আমাদের। কেরেম শালোমে ফাইনাল একটা চেক দেওয়ার পর বলে হেঁটে আগাতে। দেড় কিলোমিটার হেঁটে পার হলাম।
তারপর রেড ক্রসের লোকজন উঠল তাদের গাড়িতে, জাতিসংঘের লোকজন তাদের গাড়িতে—এগুলো সব বুলেটপ্রুফ। আর আমাদের ঢুকানো হলো এক "soft-skinned" বাসে। বাসের সামনের গ্লাসে দেখি বুলেটের চিহ্ন আছে।
এই বাসে করে আরও এক ঘণ্টা চড়ে পৌঁছালাম খান ইউনিস। রাস্তার প্রথম অংশ যায় রাফাহ দিয়ে, যেখানে ১০০% বাড়িঘর মাটিতে মিশে গিয়েছে। এর পর যায় আল-মাওয়াসি দিয়ে, যেখানে হাজার হাজার তাবুতে থাকছে মানুষ। এবং শেষমেশ এসে পৌঁছাই খান ইউনিসে, যেখানে এখনো ৪০% বিল্ডিং টিকে আছে। টোটাল জার্নি করতে লেগে গিয়েছিল প্রায় ১২ ঘণ্টা। তাও এসে নাসের হাসপাতালে পৌঁছায় মনে হলো, আলহামদুলিল্লাহ।
সত্যিকার অর্থেই একদিনে পৌঁছে গিয়েছিলাম জর্ডান নদী থেকে গাজার সাগরে—ফ্রম দ্য রিভার টু দ্য সি!