২৫ জুন ২০২৬, ১৬:৪৮

চাটমোহর এনায়েতুল্লাহ ফাজিল মাদ্রাসার সেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পুনর্বহাল

মাওলানা আবু ইসহাক (বাঁয়ে) ও রবিউল করিম বাচ্চু  © টিডিসি

পাবনার চাটমোহর এনায়েতুল্লাহ ইসলামিয়া ফাযিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা থেকে জোরপূর্বক বের করে দেয়ার ২০ মাস পর সেই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা আবু ইসহাককে পুনর্বহাল করা হয়েছে। গত ১৭ জুন তাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেও মাদ্রাসার আয়-ব্যয়সহ অন্যান্য ফাইলপত্র কিছুই বুঝিয়ে দিচ্ছেন না আগের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে পদ দখলকারী সহকারী অধ্যাপক রবিউল করিম বাচ্চু। 

এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের একটি পক্ষ স্থানীয় কিছু বিএনপি-সমর্থিত ব্যক্তির সহায়তায় তাকে মাদ্রাসা থেকে বের করে দেয়। সেই সঙ্গে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রবিউল করিম বাচ্চু নামে এক জেনারেল শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে চেয়ারে বসিয়েছিল, যা ছিল নীতিমালার পরিপন্থি। ওই সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

মাদ্রাসার বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সাল থেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন মাদ্রাসার সিনিয়র আরবি শিক্ষক মাওলানা আবু ইসহাক। মাদ্রাসার নিয়োগ কার্যক্রমের জন্য ম্যানেজিং কমিটি মিটিংয়ের মাধ্যমে একই মাদ্রাসার রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রবিউল করিম বাচ্চুকে নিয়োগকালীন সময়ের জন্য সাময়িক সাচিবিক দায়িত্ব পালন করতে বলেন এবং মাওলানা আবু ইসহাককে মাদ্রাসার সমস্ত প্রশাসনিক কাজ করতে বলেন। পরবর্তী সময়ে সরকারি এক ঘোষণায় নিয়োগের সব কার্যক্রম বাতিল হয়ে যায়। তারপর ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ৯ থেকে ১০ মাস মাদ্রাসার প্রশাসনিকসহ সব কার্যক্রম ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে মাওলানা আবু ইসহাক দায়িত্ব পালন করছিলেন।

কিন্তু নিয়োগকালীন সময়ের ওই রেজুলেশনের কথা বলে হঠাৎই নিজেকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দাবি শুরু করেন রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রবিউল করিম বাচ্চু। একই সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা আবু ইসহাকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্থানে একের পর এক অপপ্রচার চালান তিনি। তাতেও কুলিয়ে উঠতে না পেরে অবশেষে দ্বারস্থ হন স্থানীয় কাউন্সিলরসহ কিছু বিএনপি সমর্থক লোকজনের। তাদের সহায়তায় ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর মাহাতাব হোসেন, চাটমোহর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোকলেছুর রহমান বিদ্যুৎ, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিএনপি সমর্থক আব্দুস সালাম সরকারের নেতৃত্বে কিছু লোকজনকে সঙ্গে নিয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে মাওলানা আবু ইসহাকের কাছ থেকে চাবি ও ফাইলপত্র কেড়ে নিয়ে তাকে জোরপূর্বক মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়।

তার কিছুক্ষণ পর একই মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক রবিউল করিম বাচ্চুর গলায় ফুলের মালা পরিয়ে তাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে চেয়ারে বসিয়ে উল্লাস করেন তারা। পরে তারা মিষ্টি মুখ করেন। এ সময় মাদ্রাসার কিছু শিক্ষক সেখানে উপস্থিত থাকলেও তারা ভয়ে কোনো প্রতিবাদ করেননি।

ওই সময় ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়ে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন ভুক্তভোগী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা আবু ইসহাক, কিন্তু কোনো ন্যায়বিচার পাননি। এর পর থেকে জোর করে পদ দখল করা রবিউল করিম বাচ্চু ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

সূত্র জানায়, এরই মধ্যে সম্প্রতি মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটি গঠন করতে গোপনে সক্রিয় হয়ে ওঠে বিএনপির একটি পক্ষ। তারা একটি কমিটি গঠন করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রবিউল করিমকে সঙ্গে নিয়ে আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও ডিজি অফিসে যান। কিন্তু সেখান থেকে বলা হয়, জেনারেল শিক্ষক কোনোভাবেই ফাযিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হতে পারেন না। এটি নিয়মবহির্ভূত। এমপিও তালিকায় ১ নম্বরে থাকা সিনিয়র আররি শিক্ষক মাওলানা আবু ইসহাককে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দিয়ে তাকে সঙ্গে করে আনার পর কমিটি অনুমোদন হবে। তার আগে কোনোভাবেই কমিটি অনুমোদন দেওয়া হবে না। তখন তারা কূলকিনারা না পেয়ে বাধ্য হয়ে মাওলানা আবু ইসহাককে সম্প্রতি এক বিএনপি নেতার বাসায় ডেকে নিয়ে তাকে দায়িত্ব নিতে বলেন। এ সময় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রবিউল করিম বাচ্চু নিজের ভুল স্বীকার করে মাওলানা আবু ইসহাকের কাছে ক্ষমা চান এবং তাকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব বুঝে নিতে অনুরোধ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে এডিসির (শিক্ষা) মাধ্যমে একটি রেজুলেশন করে গত ১৭ ‍জুন রবিউল করিম বাচ্চুকে সরিয়ে মাওলানা আবু ইসহাককে আবার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন।

এ বিষয়ে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাওলানা আবু ইসহাক বলেন, ‘ওই সময় আমাকে বেআইনিভাবে জোর করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে সন্ত্রাসী কায়দায় পদ দখল করেছিলেন রবিউল করিম বাচ্চু। তার ভিডিও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করে আমার ৪২ বছর শিক্ষকতার ক্যারিয়ার সম্মান ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছেন। আর এখন যখন বুঝতে পারছেন তিনি অবৈধ, মাদ্রাসার কমিটি গঠন করতে পারছে না, তখন বাধ্য হয়ে আমাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে সবার অনুরোধে দায়িত্ব নিয়েছি। ওই সময় রবিউল করিম আমাকে অবৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন, তিনি নাকি ছিলেন বৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। তাহলে এখন কেন তিনি বৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হয়ে আবার সেই অবৈধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আমাকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন, এটা আমার বোধগম্য নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু ভারপ্রাপ্ত থাকাকালীন রবিউল করিম বাচ্চু গত ২০ মাসে মাদ্রাসার আয়-ব্যয়ের কোনো হিসাব ফাইলপত্র আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছেন না। আমি কাগজপত্র যেটুুকু দেখে বুঝেছি, তারা চরম আর্থিক অনিয়ম করেছেন। যার কোনো হিসাব নাই, কমিটি কর্তৃক কোনো অনুমোদনও নাই। আমি প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই, আমার ওপর হওয়া অন্যায়ের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার করা হোক। একই সঙ্গে গত ২০ মাসে মাদ্রাসার আয়-ব্যয়ের হিসাব যেন তারা বুঝিয়ে দেয়।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রবিউল করিম বাচ্চু প্রথমে কোনো মন্তব্য করতে রাজী হননি। পরে বলেন, ‘সভাপতি এডিসি স্যারের চেম্বারে মিটিং হয়েছে। মিটিংয়ের মাধ্যম দিয়ে রেজুলেশন করে তাকে (আবু ইসহাক) আবার দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়েছে। তিনি বলেন, ওই সময় রেজুলেশন করে লোকজন আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিল। আমি দায়িত্ব পালন করেছি। এর বেশি কিছু না।’

এত দিন পদে থেকে এখন পদ ছেড়ে আগেরজনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন কেন, তাহলে কি আপনি এত দিন অবৈধভাবে ছিলেন—এমন প্রশ্নসহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের আর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি রবিউল করিম বাচ্চু।

চাটমোহর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিউল ইসলাম বলেন, ‘কমিটির গঠনের লক্ষ্যে তারা যখন কমিটি নিয়ে আররি বিশ্ববিদ্যালয়ে যায়, তখন সেখান থেকে বলা হয়, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হবেন সিনিয়র আরবি শিক্ষক। জেনারেলের কোনো শিক্ষক হতে পারবেন না। তখন তারা এসে মাদ্রাসার সভাপতি এডিসি শিক্ষা স্যারের মাধ্যমে রেজুলেশন করে আবু ইসহাককে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন।’ তাহলে কি এত দিন রবিউল করিম বাচ্চু অবৈধভাবে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ছিলেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘অবৈধ ঠিক না। ওই সময় মাদ্রাসার কমিটি রেজুলেশন করে তাকে দায়িত্ব দিয়েছিল।’