বন বিভাগের আপত্তি উপেক্ষা করে সংরক্ষিত বনে বাউন্ডারি নির্মাণ, হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য
কক্সবাজারের টেকনাফে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে বন বিভাগের আপত্তি উপেক্ষা করে নির্মাণ করা হচ্ছে সুউচ্চ বাউন্ডারি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এ স্থাপনা নির্মাণ করা হলেও বন বিভাগ বলছে, এ ধরনের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। পরিবেশবিদ ও বন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, হাতির চলাচলের করিডরজুড়ে নির্মিত এই বাউন্ডারি ২৭০ প্রজাতির বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ও জীববৈচিত্র্যের জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
বিভাগীয় বন কর্মকর্তার (ডিএফও) অফিস সূত্র জানিয়েছে, বনাঞ্চলের দেওয়াল নির্মাণের জন্য বনবিভাগ থেকে কোন ধরনের অনুমতি দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন মাধ্যমে বনাঞ্চলে সুউচ্চ ও লম্বা দেওয়াল নির্মাণের খবর পেয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার তরফ থেকে কাজটি না করার জন্য কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কাছে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। বন বিভাগের নিদের্শনাকে অমান্য করে বাস্তবায়নকারী এনজিও সংস্থা অনবরত কাজটি চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। বনাঞ্চলে বাউন্ডারি নির্মাণ না করতে গত ২৬ মে বিভাগীয় বন কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত চিঠি আরআরআরসি অফিসে প্রেরণ করা হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, ২৬নং ক্যাম্পের পিছনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলে রয়েছে হাতির চলাচলের করিডর। এ করিডর দিয়ে হাতি নিয়মিত চলাচল করে। পাহাড় পরিবেষ্টিত পাদদেশে হাতি চলাচলের করিডরজুড়ে বাউন্ডারিটি নির্মিত হচ্ছে। এতে পুরো করিডরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে ওই করিডর দিয়ে হাতি চলাচলের পথ একেবারেই রুদ্ধ হয়ে যাবে। এ ছাড়া টেকনাফ বনাঞ্চলের ওই এলাকায় ২৭০ প্রজাতির বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য স্থান। পাহাড়ের ওই এলাকাজুড়ে প্রাকৃতিগতভাবে পশুপাখির খাদ্যের উৎপাদনস্থল। দেখা গেছে, বনের মধ্যে দেয়াল নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের পথে। এখনো পলেস্তার তথা ফিনিশিংয়ের কাজ বাকি রয়েছে। পাহাড় পরিবেষ্টিত বিশাল আয়তনজুড়ে সুউচ্চ দেয়ালটি নির্মিত হওয়ায় হাতি চলাচলের করিডর যেমন বন্ধ হয়ে পড়বে, তেমনি জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে। বন বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, বন ও বন্য প্রাণী অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৬ নম্বর শালবাগান ক্যাম্পের প্রান্ত সীমানায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতের নির্মিতব্য সুউচ্চ এই বাউন্ডারি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে নির্মিতব্য বাউন্ডারির উচ্চতা ৫ মিটার ও দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩৭মিটার। নির্মাণকাজ তদারকে নিয়োজিত মুখতার নামের এক প্রতিনিধি জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ানে ইউএনডিপি সরাসরি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছেন। ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য এটি করা হচ্ছে বলে ওই প্রতিনিধি জানিয়েছেন।
তবে স্থানীয়দের মতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বনের ভেতরে এত বিশাল এলাকাজুড়ে সুউচ্চ বাউন্ডারি নির্মাণ হলে জীববৈচিত্র্যের যেমন ক্ষতিতে পড়বে, তেমনি ক্যাম্পে বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের জন্যও দূর ভবিষ্যতে এটি অন্যতম ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। রোহিঙ্গা নেতাদের মতে, নিকট ভবিষ্যতে ওই বাউন্ডারিকে কেন্দ্র করে আশপাশের এলাকা অপরাধজোন হিসেবে গড়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের শালবাগান ও ন্যাচারপার্ক এলাকাস্থ সংরক্ষিত বনে প্রায় ২৭০ প্রজাতির বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রয়েছে। বনাঞ্চনের গহিনে তাদের বিচরণ স্বাভাবিক বিচরণ থাকলেও। বনে রোহিঙ্গাদের বিচরণ ও তাদের আবাসস্থল নির্মাণের কারণে বন্য প্রাণী গহিন বনে নিজেদের আপন ঠিকানা করে নিয়েছেন। তবে অনেক বন্য প্রাণী অন্যত্রে চলে গেছে। অনেক বন্য প্রাণী বিলুপ্তির পথে। বন ও বন্যপ্রাণি গবেষকদের মতে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের লেদা থেকে শালবাগান ও ন্যাচার পার্ক বন পশু পাখির অভয়ারণ্য। উল্লেখিত বনাঞ্চল পশু-পাখির খাদ্যস্থল। রোহিঙ্গাদের চলাচলের কারণে পশু-পাখি এখন বনের গহিনে চলে গেলেও তাদের বিচরণ রয়েছে টেকনাফ গেম রিজার্ভের ওই সব এলাকায়।
টেকনাফ রেঞ্জের আওতাধীন বনপাহারা দলের সদস্যরা জানান, টেকনাফ রেঞ্জের মুচনী বিটের ওই এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির বানর, শিয়াল, ভাল্লুক, বন মোরগ, হাতি, সরীসৃপ প্রাণীসহ বন্য প্রাণীর বিচরণ এখনো চোখে পড়ে। রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসস্থল তৈরির কারণে বন্য প্রাণীর জন্য বনের কাছাকাছি জীববৈচিত্র্যময় জায়গা এখন বন্য প্রাণীর জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। তাই তারা গহিন বনে নিজেদের ঠিকানা করে নিয়েছেন। এতেও এদিকে খাদ্যসংকট। অন্যদিকে বিপন্ন আবাসস্থল। এতেই মহাসংকটাপন্নে টেকনাফের বনাঞ্চল ও বন্য প্রাণী।
এর মধ্যে মুচনী বিটের শালবাগানের ওপারে বনের মধ্যে সুউচ্চ ও বিশাল আয়তনের বাউন্ডারি নির্মিত হলে ২৭০ প্রজাতির বন্য প্রাণীর চলাচল হুমকির মুখে পড়বে। এ ছাড়া বনাঞ্চলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র গড়ে উঠলে বন্য প্রাণী এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হবে। বন্য প্রাণীর চলাচলের পথ নিশ্চিত করা যেমন প্রয়োজন। তেমনি বনের গাছগাছালি এবং বন্য প্রাণীর স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।
বন্য প্রাণী গবেষক সরোয়ার আলম দীপু বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে স্থাপনা বা কোন ধরনের কিছু করতে হলে সবার আগে অবশ্যই ‘এনভাইরেন্টমেন্ট ইমপেক্ট অ্যাসেসমেন্ট’ তথা ইআইএ করতে হবে। যাতে করে ভবিষ্যতে যেন বন এবং বন্য প্রাণীর উপর যেন কোনো প্রভাব না পড়ে।
এদিকে ২৬ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান বলেন, ‘আসলে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের কোন হাত নেই। যদ্দুর জানি, আরআরআরসির মাধ্যমে ইউএনডিপি প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছেন।’
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা-ডিএফও (কক্সবাজার দক্ষিণ) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের হাতি চলাচলের করিডরে বিশাল আয়তনজুড়ে সুউচ্চ ওয়াল নির্মিত হওয়ার বিষয়টি অবগত হওয়ার পর পরই কাজটি বন্ধ রাখতে তিনি আরআরআরসিকে লিখিতভাবে জানান।