ইতালিতে প্রবাসীর মৃত্যু, বাবার মরদেহ ফেরাতে কাঁদছে তিন মেয়ে
বাগেরহাটের জিন্নাত খান খোকন পরিবারের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে ইউরোপে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগেই ইতালিতে তার মৃত্যু হয়েছে। এখন অর্থাভাবে মরদেহ দেশে আনতে না পেরে অসহায় হয়ে পড়েছে পরিবার। বাবার মরদেহ শেষবারের মতো দেখতে এবং দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহায়তা চেয়ে আকুতি জানাচ্ছে তার তিন মেয়ে।
জিন্নাত খান খোকন গ্রামের মৃত লুৎফর রহমান খানের ছেলে। তিনি স্ত্রী সুমি বেগম, বড় মেয়ে জেরিন আক্তার (১৪), মেজো মেয়ে জিনিয়া খানম (৮), আড়াই বছরের ছোট মেয়ে জাকিয়া আক্তার এবং ৭০ বছর বয়সী মা জরিনা বেগমকে রেখে গেছেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, উন্নত জীবনের আশায় প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করে খোকন প্রথমে বৈধভাবে বুলগেরিয়ায় যান। পরে সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণ পানিপথে ইতালিতে প্রবেশ করেন। বিদেশে যাওয়ার জন্য তিনি নিজের বসতভিটাসহ পরিবারের শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করেন এবং বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঋণ নেন।
স্বজনদের ভাষ্য, পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আশায় ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দেশ ছাড়েন খোকন। কিন্তু বিদেশে গিয়েও কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক স্থিতি নিশ্চিত করতে না পেরে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে গত ১৯ জুন ইতালিতে তার মৃত্যুর খবর পরিবারে পৌঁছায়।
খোকনের মামাতো ভাই শেখ তানভির হাসান বলেন, ‘বিদেশে যাওয়ার জন্য খোকন নিজের ভিটেমাটিও বিক্রি করেছিল। পরিবারের ভালো ভবিষ্যতের আশায় সে দেশ ছেড়েছিল। কিন্তু ঋণের চাপ ও হতাশাই শেষ পর্যন্ত তার জীবন কেড়ে নিল।’
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা অসহায় হয়ে পড়েছে। মরদেহ দেশে আনতেও বিপুল অর্থের প্রয়োজন, যা তাদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।’
প্রতিবেশী মো. মিজান বলেন, ‘এলাকার মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তার চেষ্টা করছেন। তবে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা জরুরি।’
মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বৃদ্ধা মা জরিনা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘বিদেশে যাওয়ার সময় ছেলে আমাকে বলেছিল, অনেক টাকা আয় করে চিকিৎসা করাবে। আজ সে আর নেই। আমি শুধু শেষবারের মতো আমার ছেলের মুখ দেখতে চাই। সরকারের কাছে আবেদন, আমার ছেলের মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করা হোক।’
স্ত্রী সুমি বেগম বলেন, ‘স্বামীকে বিদেশ পাঠাতে অনেক কষ্ট করেছি, ঋণ করেছি। এখন তার মরদেহ দেশে আনার টাকাও আমাদের নেই। ছোট তিনটি মেয়েকে নিয়ে কীভাবে জীবন চলবে, সেটাও জানি না।’
বড় মেয়ে জেরিন আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, ‘আমি শুধু চাই, বাবাকে শেষবারের মতো একবার দেখতে। বাবার মরদেহটা যেন দেশে আনা হয়।’
স্বজনরা জানান, ইতালি থেকে খোকনের মরদেহ দেশে আনতে প্রায় ৭ লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু অর্থাভাবে সেই টাকা জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছে পরিবারটি।
এ অবস্থায় স্থানীয়রা সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং সমাজের বিত্তবান মানুষের প্রতি মানবিক সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হলে পরিবারটি শেষবারের মতো প্রিয়জনকে বিদায় জানানোর সুযোগ পাবে।