১৪ জুন ২০২৬, ১১:১০

প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, হাসপাতালে নেওয়ার পথেই ইউপি সদস্যের মৃত্যু

আফরোজা বেগম  © সংগৃহীত

গাইবান্ধার ফুলছড়িতে পঞ্চম সন্তান প্রসবের পর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আফরোজা বেগম (৩৮) নামের এক ইউপি সদস্যের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১৩ জুন) চরাঞ্চল থেকে নৌকা ও অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে জেলা হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল, তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়। তিনি নবজাতক কন্যাসন্তান, তিন ছেলে ও স্বামীকে রেখে গেছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, আফরোজা বেগমের আগে চার ছেলেসন্তান ছিল। দীর্ঘদিন পর কন্যাসন্তান হওয়ায় পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের মধ্যে বিরাজ করছিল উৎসবের আমেজ। শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বাড়িতেই জন্ম নেয় ওই কন্যাশিশু। কিন্তু প্রসবের কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হয় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ। আফরোজার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে থাকলে স্বজনেরা তৎক্ষণাৎ তাকে হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

কালাসোনার চর নদীবেষ্টিত। সেখানে কোনো হাসপাতাল বা জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র না থাকায় প্রথমে নৌকাযোগে নদী পাড়ি দিয়ে মূল ভূখণ্ডের মৌলভী চর ঘাটে আনা হয় আফরোজাকে। সেখান থেকে দ্রুতগতির একটি অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়া হচ্ছিল গাইবান্ধা জেলা হাসপাতালে। অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন বেজে চলেছে, স্বজনরা চিৎকার করছেন। কিন্তু বেলা সাড়ে ১১টার দিকে—হাসপাতালের মূল ফটক থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে—আফরোজার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আফরোজা বেগম ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া ইউনিয়নের ৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী সদস্য ছিলেন। টানা পাঁচ বছর তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। এলাকার উন্নয়ন ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় তিনি সাধারণ মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন।

তার স্বামী রফিকুল ইসলাম জানান, এক বছর আগে তাদের বড় ছেলে মারা যায়। সেই শোক কাটতে না কাটতেই আফরোজার অকালমৃত্যু পরিবারটিকে আরও নিঃস্ব করে দিল। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘জন্মের দিনেই আমাদের কন্যাসন্তানের মাথা থেকে মায়ের ছায়া সরে গেল। তিন ছেলে ও ওই নবজাতককে নিয়ে কীভাবে বাঁচবো, কিছুই বুঝতে পারছি না।’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সঠিক সময়ে রক্ত সঞ্চালন ও প্রসবোত্তর জরুরি সেবা পেলে আফরোজা বেগমের জীবন রক্ষা সম্ভব ছিল। কিন্তু চরাঞ্চলে পর্যাপ্ত হাসপাতাল, দক্ষ কর্মী ও জরুরি পরিবহনব্যবস্থার অভাবে বারবার মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে।

উড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা কামাল পাশা বলেন, ‘আফরোজা বেগম ছিলেন সৎ, দায়িত্বশীল ও জনবান্ধব জনপ্রতিনিধি। ইউনিয়নের উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে তিনি নিবেদিতভাবে কাজ করে গেছেন। তার অকালমৃত্যুতে এক শূন্যতা তৈরি হলো, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।’

ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম বলেন, ‘আফরোজা বেগম মানুষের সুখ-দুঃখের সঙ্গী ছিলেন। এলাকার যেকোনো সমস্যায় সবার আগে এগিয়ে আসতেন। আমরা একজন সহকর্মী নয়, একজন মানবিক মানুষকে হারালাম।’

পল্লিচিকিৎসক সাইফুল ইসলাম জানান, প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণে দ্রুত রক্ত সঞ্চালন ও জরায়ু সংকোচনের ওষুধ প্রয়োজন। আমাদের চরাঞ্চলে এ সুযোগ নেই। দূরের হাসপাতালে নিতে গিয়ে সময়মতো সেবা দেওয়া যায় না।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ মাতৃমৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর একটি। সঠিক সময়ে রক্ত সঞ্চালন ও জরায়ু সংকোচনের ওষুধ প্রয়োগ করলে অধিকাংশ মৃত্যুই প্রতিরোধযোগ্য। চরাঞ্চলে ভাসমান ক্লিনিক, প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফ ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থার জোরালো প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তারা।

ফুলছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রায়ই এমন রোগী আসেন যারা নৌকা-অ্যাম্বুলেন্সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথ পাড়ি দিয়ে আমাদের কাছে পৌঁছান। ততক্ষণে অনেকের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হয়ে যায়। চরাঞ্চলে মাতৃমৃত্যুর হার কমানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভাসমান স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসকবিহীন কমিউনিটি ক্লিনিকের ব্যবধান পূরণে জেলা প্রশাসনের সমন্বয় প্রয়োজন।

নবজাতক কন্যাটি এখন প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের কাছে দুধ খাচ্ছে। তার নাম এখনো রাখা হয়নি। বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘মা ডাকতেই নাম দিতে চাই। এখন কে ডাকবে?’

এদিকে গাইবান্ধা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নবজাতকের ভরণপোষণ ও বাকি শিশুদের শিক্ষার বিষয়ে পরিবারকে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু আর্থিক সহায়তা নয়—প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। চরাঞ্চলে ২৪ ঘণ্টা চালু মাতৃসেবা কেন্দ্র, রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা ও জরুরি অ্যাম্বুলেন্স নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন তারা।