১০ জুন ২০২৬, ১৭:২৫

বজ্রপাত থেকে রক্ষায় ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, ছয় বছরেও বাড়েনি ‘কৃষক ছাউনি’

কৃষক ছাউনিতে বসে আছেন কয়েকজন  © টিডিসি

চারদিকে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ। সদ্য কাটা বোরো ধানের খড়ের গন্ধ এখনো ভাসছে বাতাসে। মাথার ওপর প্রখর রোদ। মাঠের মাঝখানে খড়ের ছাউনি দেওয়া একটি ছোট ঘরে বসে আছেন কয়েকজন যুবক ও কৃষক। কেউ বিশ্রাম নিচ্ছেন, কেউ গল্প করছেন। গ্রামের মানুষের কাছে এটি শুধু একটি ঘর নয়, বরং বিপদের সময় নিরাপদ আশ্রয়স্থল। নাম তার ‘কৃষক ছাউনি’।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সোনারায় ইউনিয়নের শিবরাম গ্রামে বজ্রপাত থেকে কৃষকদের রক্ষায় নির্মিত এই ব্যতিক্রমী ছাউনিটি ছয় বছর ধরে মাঠে কর্মরত মানুষের আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করছে। তবে কৃষকদের প্রশংসা কুড়ানো এই উদ্যোগের সম্প্রসারণ আর হয়নি। ফলে উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল ও খোলা মাঠে এখনো ঝুঁকি নিয়েই কাজ করছেন হাজারো কৃষক।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি বিভাগের দাবি, ছাউনিটি নির্মাণের পর থেকে ওই এলাকায় বজ্রপাতে কোনো কৃষকের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। আকাশে কালো মেঘ দেখা দিলেই কিংবা ঝড়বৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হলেই কৃষকেরা দ্রুত সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন।

গাইবান্ধা জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম জানান, গত বছরের জুলাই থেকে চলতি বছরের ৫ জুন পর্যন্ত জেলায় বজ্রপাতে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ১৫ থেকে ২০ জন। এমন বাস্তবতায় কৃষক ছাউনি উদ্যোগটি আরও বিস্তৃত করার দাবি উঠেছে স্থানীয়দের মধ্যে।

সরেজমিনে দেখা যায়, গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের শিবরাম গ্রামের মাঠের মাঝে নির্মিত ছাউনিটির কোনো বেড়া নেই। খড়ের ছাউনির নিচে বসার জন্য রয়েছে পাকা বেঞ্চ। মাঠে কাজের ফাঁকে কৃষকেরা সেখানে বিশ্রাম নেন, খাবার খান কিংবা ঝড়-বৃষ্টির সময় আশ্রয় নেন।

স্থানীয়রা জানান, কৃষকদের বজ্রপাতের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে তৎকালীন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ রেজা-ই-মাহমুদের উদ্যোগে ছাউনিটি নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে তিনি নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বীজ প্রত্যয়ন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

সৈয়দ রেজা-ই-মাহমুদ বলেন, ‘পত্রিকা খুললেই বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যুর খবর দেখা যেত। বিশেষ করে চরাঞ্চলে এই ঝুঁকি বেশি। কৃষকদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই কৃষক ছাউনি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। শুধু আশ্রয় নয়, কৃষকেরা এখানে বসে বিশ্রাম নিতে ও খাবার খেতেও পারেন।’

তিনি জানান, কৃষক ছাউনি প্রকল্পটি বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়নের জন্য কৃষি অধিদপ্তরে একটি প্রকল্প প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছিল। তবে সেটি অনুমোদনের মুখ দেখেনি।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের মার্চ মাসে প্রায় ৩৮ হাজার টাকা ব্যয়ে শিবরাম গ্রামের খোলা মাঠে ছাউনিটি নির্মাণ করা হয়। ওই বছরের ৫ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে অন্তত ৫০টি কৃষক ছাউনি নির্মাণে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়নি।

শিবরাম গ্রামের কৃষক আল আমিন বলেন, ‘আগে মাঠে কাজ করতে গিয়ে বৃষ্টি বা বজ্রপাত শুরু হলে কোথাও আশ্রয় নেওয়ার জায়গা ছিল না। এখন অন্তত এই ঘরটিতে এসে নিরাপদে থাকতে পারি।’

একই গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘প্রচণ্ড রোদ, ঝড় কিংবা বৃষ্টির সময় আমরা এখানে বিশ্রাম নিতে পারি। দুপুরের খাবারও খাই। কৃষকদের জন্য এটি খুবই উপকারী উদ্যোগ।’

শিবরাম আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুল আলম মনে করেন, কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান এলাকায় এ ধরনের ছাউনি নির্মাণ করা উচিত।

কৃষক ছাউনির সংখ্যা বাড়েনি কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে গাইবান্ধা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক রোস্তম আলী বলেন, বরাদ্দ না থাকায় নতুন করে কৃষক ছাউনি নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি।

এ বিষয়ে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, শিবরামে পরীক্ষামূলকভাবে কৃষক ছাউনি নির্মাণে ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করেছিলাম। কৃষকেরা এর সুফল পেয়েছেন। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে আরও প্রায় ৫০টি ছাউনি নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অর্থসংকটের কারণে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।

বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলে কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই কৃষক ছাউনি এখন একটি সফল উদাহরণ। স্থানীয়দের দাবি, একটি ছাউনি ছয় বছর ধরে সুফল দিচ্ছে, তাহলে জেলার অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও এমন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে বহু কৃষকের প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হবে।