দুই-তিন গুণ বেশি ভাড়া নিচ্ছে সদরঘাটের বাসগুলো
‘মিরপুর একশ, মিরপুর একশ। ডাইরেক্ট গাড়ি, মিরপুর এক’ বাসের দরজা অর্ধ-বন্ধ করে চিৎকার করছেন সদরঘাট থেকে মিরপুরগামী ‘বিহঙ্গ’ বাসের এক হেলপার। আবার ‘সাভার দুইশো, সাভার দুইশো’ বলে একই ভাবে যাত্রী তুলছেন ‘সাভার পরিবহন’ বাসের হেলপাররা।
সদরঘাট থেকে মিরপুরে ভাড়া ৪০-৫০ টাকা এবং সাভারে ৭০-৮০ টাকা সাধারণ ভাড়া হলেও এমন চিত্র দেখা গেছে সদরঘাটের নিকটবর্তী রায়সাহেব বাজার মোড় থেকে।
সরেজমিন যা দেখা গেল
সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে সকালে সকল লঞ্চগুলো পৌঁছানোর কারণে ফজর পর থেকে চাপ থাকে যাত্রীদের। এ কারণেই সদরঘাট থেকে রায়সাহেব বাজার মোড় পর্যন্ত প্রায় অর্ধ কিলোমিটারের বেশি রাস্তায় যানজট দেখা মেলে। অধিকাংশ যাত্রীরা সদরঘাটে লঞ্চ থেকে নেমে হেঁটেই চলে আসেন রায়সাহেব বাজার মোড়ে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও আশেপাশের প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ এবং বাস মালিক সমিতির যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো বাস রায়সাহেব বাজার মোড় পার হয়ে সদরঘাটের দিকে যেতে পারবেন না। দিনের দিনের বেলা নিয়ম মানা হলেও রাত ১২টার পরে কোনো তোয়াক্কা না করে টাকার বিনিময়ে সদরঘাটে লাইন ধরতে থাকে বাসগুলো। পরে সকালে যাত্রীদের কাছ থেকে দুই-তিন গুণ ভাড়া তোলার মাধ্যমে চাঁদার টাকা সুদে আসলে উসুল করা হয়।
যাত্রীদের অভিযোগ কী
প্রত্যক্ষদর্শী যাত্রীদের অভিযোগ, মিরপুর যেতে সাধারণ ভাড়া ৫০ টাকা। কিন্তু তাঁরা দরজা আটকিয়ে ১০০ টাকা করে চাচ্ছেন। আবার গাজীপুর, সাভার, চন্দ্রা, নবীনগর একই অবস্থা। সবখানেই ডাবল ভাড়া নিচ্ছে। কাছে কোথায় যেতে হলে ওই একই ভাড়া দিতে হচ্ছে। এতে দুই-তিন গুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলছেন তাঁরা।
মিরপুরগামী যাত্রী আমেনা হক বলেন, একজন যাত্রী কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন, বলেন। নিরুপায় হয়ে যেতেই হচ্ছে আমাদের। সদরঘাট থেকে মিরপুর ১২ তে ভাড়া হচ্ছে ৫০ টাকা। কিন্তু বিহঙ্গ বাস জোর করে চাপিয়ে ১০০ টাকা নিচ্ছেন।
হ্যাঁ, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রায়সাহেব বাজার থেকে সদরঘাটের দিকে কোনো বাস যেতে পারবে না। যদি রাত ১২টার পর কোনো বাস সদরঘাটের দিকে ঢোকে তাদের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের উপস্থিতিতে বা সহায়তায় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হলে প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে- মো. মফিজুল ইসলাম, ডিসি , লালবাগ জোন (ট্রাফিক), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।
বিশ মিনিটের অধিক সময় দাঁড়িয়ে থাকা টেকনিক্যালগামী যাত্রী শওকত হোসেন অভিযোগের সুরে বলেন, ‘সাভারে মূল ভাড়া ৭০/৮০ টাকা। তাঁরা ‘ডাইরেক্ট সাভার’ বলে চিল্লাইয়া ২০০ টাকা করে নিচ্ছেন। এখন আমাকে বলছেন, যেখানেই নামেন না কেন ২০০ টাকা। কোনে কম হবে না। ২০০ টাকা না দেওয়ায় চারটি বাস আমাকে নেয়নি। আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়!’
অনুসন্ধানে যা মিলল
জানা যায়, গভীর রাতে রায়সাহেব বাজার মোড় থেকে সদরঘাটের দিকে বাস ঢুকায় বাস চালকগণ। যাদের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল কলেজের একটি চক্র জড়িত আছেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাসচালকদের প্রটেকশন দেওয়ার বিনিময়ে বেশ মোটা অংকের টাকা নিচ্ছেন তাঁরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, রাত ১২টার পর থেকেই সদরঘাটের দিকে বাসগুলো ঢুকতে শুরু করে। এখানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়ধারী একটি চক্র বাসচালদের কাছ থেকে টাকা তোলেন। পুলিশ বিষয়গুলো জানেন। তবুও তাঁরা কিছু বলেন না।
সদরঘাটের একজন চা বিক্রেতা ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘শেষ রাতের দিকে বাসগুলো ঢুকতে শুরু করে। তখন রাতের বেলা কিছু নেতাদের টাকা নিতে দেখা যায়। পুলিশও টাকা নেয়। তাদের সহায়তা না থাকলে তো আর বাসগুলো ঢুকতে পারেন না।’
যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতে গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ট্রাফিক লালবাগ জোনের কর্মকর্তাবৃন্দ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, ঢাকা মহানগর মহিলা কলেজ, বাংলা বাজার সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ, পোগোজ ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কলেজিয়েট স্কুলসহ পাশ্ববর্তী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক প্রতিনিধি, জবি’র বিভিন্ন ক্রীয়াশীল ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ঢাকা আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ, বাংলাদেশ মোটর পার্টস এসোসিয়েশন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সম্মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত হয়, রায়সাহেব বাজার থেকে বাহাদুর শাহ পার্ক পর্যন্ত বাস ও লেগুনার চলাচলে চলমান নিষেধাজ্ঞা স্থায়ীভাবে কার্যকর থাকবে। ফজর ও রাতের শেষ ভাগে যেসব বাস চলাচল করত, সেগুলোকেও এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হবে।
এ ছাড়া রিকশা চলাচল সহজীকরণে রায়সাহেব বাজার থেকে সদরঘাট পর্যন্ত ভাড়া নির্ধারণের জন্য প্রক্টরের নেতৃত্বে একটি উপকমিটি, রিকশার পাশাপাশি ই-কার পরীক্ষামূলকভাবে চলাচল করা যায় নাকি সে বিষয়ে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরন, মোটরচালিত রিকশার গতি নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশনের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় স্থানে স্পিড ব্রেকার স্থাপন এবং বিশ্বজিৎ চত্বরে একটি স্মারক নির্মাণ করা হবে সিদ্ধান্ত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব ও সার্বিক পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন জবি শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দিন। তিনি বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্বে আছেন।
যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া সহ নানা ভোগান্তি, সকালে সদরঘাটে বাস নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে খবর পেয়েছি। এখানে বিরাট একটা সিন্ডিকেট জড়িত। চক্রটিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ কেউ জড়িত আছেন বলে জেনেছি। এদের পরিচয় আমিও খুঁজছি। এসব অনিয়ম কাজের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ জড়িত থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি- অধ্যাপক ড. রইস্ উদ্দিন, উপাচার্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
এ ব্যাপারে বক্তব্য নিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল ও সদস্য সচিব শামসুল আরেফিনকে ফোন দিয়ে পাওয়া যায়নি। পরে শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম-আহ্বায়ক শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘বাসগুলো ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কোনো ছাত্রসংগঠনকে সেখানে যাওয়া ঠিক হবে না। আমরা এ ব্যাপারে পুলিশ প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলবো।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি ইব্রাহীম খলিল বলেন, ‘বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য তৎকালীন সময়ে এ উদ্যোগ নিয়েছিল। এ সমস্যা সমাধানে তাকেই গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি সকল ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে নিয়ে বসে সমাধান করা যেতে পারে।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি ইভান তাহসীব বলেন, ‘অতীতে সকল ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠন মিলে সিদ্ধান্ত হয়েছিল যে, কোনো বাস সদরঘাটের দিকে প্রবেশ করতে পারবে না। এখন যেহেতু বিষয়টি মানা হচ্ছে না, সবাইকে নিয়ে আবার বসা যেতে পারে। ঢাকায় ফিরে বিস্তারিত বলতে পারব।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ট্রাফিক) লালবাগ জোনের ডিসি মো. মফিজুল ইসলাম ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘হ্যাঁ, সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রায়সাহেব বাজার থেকে সদরঘাটের দিকে কোনো বাস যেতে পারবে না। যদি রাত ১২টার পর কোনো বাস সদরঘাটের দিকে ঢোকে তাদের প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পুলিশের উপস্থিতিতে বা সহায়তায় যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হলে প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইস্ উদ্দিন বলেন, ‘যাত্রীদের কাছ থেকে বেশি ভাড়া সহ নানা ভোগান্তি, সকালে সদরঘাটে বাস নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে খবর পেয়েছি। এখানে বিরাট একটা সিন্ডিকেট জড়িত। চক্রটিতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ কেউ জড়িত আছেন বলে জেনেছি। এদের পরিচয় আমিও খুঁজছি। এসব অনিয়ম কাজের সঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ জড়িত থাকলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।’