০৪ জুন ২০২৬, ১৫:৫৮

একই কর্মস্থলে ৩০ বছর, উঠেছে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

রামগঞ্জ পৌরসভা (ইনসেটে মো. জাকির হোসেন হেলাল)  © সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. জাকির হোসেন হেলালের বিরুদ্ধে ঠিকাদারি ব্যবসা, স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার অপব্যবহার, কর্মচারীদের হয়রানি এবং বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি চাকরি বিধিমালা উপেক্ষা করে রামগঞ্জ পৌরসভা তিনি নিজ এলাকায় একই কর্মস্থলে দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কর্মরত রয়েছেন। দুই দফা বদলির আদেশ হলেও রহস্যজনক কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়।

পৌরসভার বিক্ষুদ্ধ কর্মচারী ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, দীর্ঘদিন একই স্থানে কর্মরত থাকার সুযোগে তিনি একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে তুলেছেন। ফলে পৌরসভার প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনিয়ম ও দুর্নীতি সহজে পরিচালনা করতে সক্ষম হচ্ছেন। স্থানীয়রা বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, মো. জাকির হোসেন হেলাল ১৯৯৫ সালে রামগঞ্জ পৌরসভায় লাইসেন্স পরিদর্শক হিসেবে যোগদান করেন। ২০০৩ সালে তিনি প্রধান সহকারী পদে পদোন্নতি লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৫ সাল থেকে ১২তম গ্রেডে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

সূত্র আরও জানায়, ২০১২ সালে তাকে খাগড়াছড়ির রামগড় পৌরসভায় এবং ২০২৫ সালে নোয়াখালীর কবিরহাট পৌরসভায় বদলির আদেশ দেওয়া হয়। তবে যোগদানের পূর্বেই অজ্ঞাত কারণে উভয় বদলির আদেশ স্থগিত হয়ে যায়।

সরকারি চাকরি বিধিমালা এবং স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে জারিকৃত পরিপত্র অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী একই কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে পারেন না। এ ছাড়া প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নিজ জেলা বা স্থানীয় এলাকায় পদায়নের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি পূর্বানুমতি ছাড়া কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিজ নামে, বেনামে বা পোষ্যদের ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা অন্য কোনো লাভজনক পেশায় জড়িত থাকতে পারেন না।

স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, জাকির হোসেন হেলাল রামগঞ্জ জিয়া শপিং কমপ্লেক্স ব্যবসায়ী পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই মার্কেটে তার ‘তাজিন ফ্যাশন’ নামে একটি গার্মেন্টস ব্যবসা রয়েছে। এ ছাড়া ‘মাহমুদা করপোরেশন’ নামে একটি ঠিকাদারি লাইসেন্সের মাধ্যমে পৌরসভার উন্নয়নমূলক কাজের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পৌরসভার কয়েকজন কর্মচারী জানান, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে রামগঞ্জ পৌরসভায় কর্মরত থাকা জাকির হোসেন হেলাল বিভিন্ন মেয়র ও প্রশাসকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ তার অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তাকে বিভিন্নভাবে হুমকি-ধমকি ও হয়রানির শিকার হতে হয়। তারা আরও অভিযোগ করেন, তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না এবং ঠিকাদারি ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে বেশি সময় ব্যয় করেন।

তাদের অভিযোগ, ২০১৮ সালে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দে স্থাপিত ৩০০ গভীর নলকূপের প্রকল্পে উপকারভোগীদের কাছ থেকে প্রতি নলকূপে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়। নিম্নমানের কাজ ও অনিয়মের কারণে বর্তমানে এসব নলকূপের প্রায় ৮০ শতাংশ অকেজো হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সাবেক পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র আবুল খায়ের পাটোয়ারীর সঙ্গে যোগসাজশে পৌরসভা-সংলগ্ন আবাসন প্রকল্পের রাস্তা নির্মাণে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আইইউজিআইপি উন্নয়ন প্রকল্পের প্রায় ১ কোটি টাকার কাজ নিজস্ব লোকজনকে নিয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে পরিচালনা করে তিনি পরোক্ষভাবে ঠিকাদারি কার্যক্রমে জড়িত বলে অভিযোগ করেন তারা।

কর্মচারীরা আরও দাবি করেন, তার বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অতীতে মামলা, পোস্টারিং, সংবাদ প্রকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি; বরং বদলির আদেশ জারি হওয়ার পরও তিনি বহাল তবিয়তে কর্মস্থলে থেকে যান। ফলে তার প্রভাব ও হয়রানির ভয়ে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না।

এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল্লাহ, আনোয়ার ও হাবিবুর রহমানসহ কয়েকজন বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তা একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করলে স্বার্থেও সংঘাত, প্রভাব বিস্তার এবং দুর্নীতির ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বিষয়টি তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

তারা এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

অভিযোগের বিষয়ে মো. জাকির হোসেন হেলাল বলেন, ‘বাংলাদেশের অনেক পৌরসভায় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নিজ নিজ এলাকায় দায়িত্ব পালন করেন। আমিও বিধিবিধান অনুসরণ করেই চাকরি করছি। আমি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছি। ঠিকাদারি লাইসেন্সটি আমার শ্যালকের নামে। ওই লাইসেন্স নিয়ে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি হয়েছে। পৌরসভার আবাসন প্রকল্পের রাস্তা নির্মাণকাজে জমির মালিকদের কাছ থেকে ৩২ লাখ টাকা পাওয়া গেছে। তবে কাজ সম্পন্ন করতে ৩৩ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ব্যয়ের প্রতিটি টাকার হিসাব সংরক্ষিত আছে।’

তিনি বলেন, আইইউজিআইপি চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী গঠিত কমিটির সদস্যরা পরিচালনা করছেন। আমি মাঝেমধ্যে তাদের প্রয়োজনীয় ইট, পাথরসহ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী ক্রয়ে সহযোগিতা করি এবং কাজের তদারকি করি। আমার বিরুদ্ধে অফিসের যেসব ব্যক্তি অভিযোগ করছেন, তারা অনেক সময় যথাসময়ে অফিসে উপস্থিত হন না অথবা দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন না। এ বিষয়ে আমি তাদের সতর্ক করলে তারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অপপ্রচার চালান।’

এ বিষয়ে রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক কাজী আতিকুর রহমান বলেন, ‘পৌর প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাকির হোসেন হেলালের বিরুদ্ধে ব্যবসা-বাণিজ্য, ঠিকাদারি কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা, কর্মচারীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ এবং দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের বিষয় অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই করে সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’