২৭ মে ২০২৬, ১৪:২৬

সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ১২ জেলায় গ্রামে গ্রামে ঈদ উদযাপন

কোলাজ ছবি   © টিডিসি সম্পাদিত

সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে মিল রেখে দেশের অন্তত ১২ জেলার বিভিন্ন গ্রামে বুধবার (২৭ মে) পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করেছেন হাজারো মুসল্লি। চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ফরিদপুর, ঝিনাইদহ, বরগুনা, সাতক্ষীরা, রাজশাহী, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, ভোলা, নোয়াখালী ও কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় একদিন আগেই ঈদের নামাজ আদায় ও পশু কোরবানি করা হয়।

বিভিন্ন দরবার শরীফ, কাদেরিয়া তরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের চাঁদ দেখার অনুসারীরা দাবি করেছেন, বহু বছর ধরেই তারা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও দুই ঈদ পালন করে আসছেন। কোথাও কোথাও বৈরী আবহাওয়া ও বৃষ্টির মধ্যেও ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে।

চাঁদপুরে অর্ধশতাধিক গ্রামে ঈদ

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ, মতলব ও কচুয়া উপজেলার অর্ধশতাধিক গ্রামে ঈদ উদযাপন করা হয়। হাজীগঞ্জ উপজেলার সাদ্রা দরবার শরীফকে কেন্দ্র করে সকাল ৮টায় প্রথম ও সাড়ে ৮টায় দ্বিতীয় জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

প্রথম জামাতে ইমামতি করেন পীর মাওলানা আরিফ চৌধুরী এবং দ্বিতীয় জামাতে ইমামতি করেন পীর জাকারিয়া চৌধুরী আল মাদানি।

সাদ্রা দরবারের পীর মাওলানা আরিফ চৌধুরী বলেন, ‘সারাবিশ্বে আজ ঈদ উদযাপিত হচ্ছে, আমরাও সেই অনুযায়ী ঈদ পালন করছি। সরকারি ঘোষণার কারণে অনেকেই আমাদের সঙ্গে একসঙ্গে ঈদ করতে পারছেন না। তবে মানুষ এখন ধীরে ধীরে সরকারের ঘোষণার অপেক্ষা না করে আন্তর্জাতিকভাবে মিল রেখে ঈদ উদযাপনের দিকে ঝুঁকছেন।’

জানা যায়, ১৯২৮ সাল থেকে সাদ্রা দরবার শরীফে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও ঈদ উদযাপনের প্রথা চালু হয়।

লক্ষ্মীপুরের ১১ গ্রামে ঈদ

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ, রায়পুর ও সদর উপজেলার ১১টি গ্রামের মানুষ বুধবার ঈদুল আজহা উদযাপন করেন। সকাল ৮টায় রামগঞ্জ উপজেলার খানকায়ে মাদানিয়া কাসেমিয়া মাদ্রাসা ও নোয়াগাঁও ঈদগাহ ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

স্থানীয়রা জানান, মাওলানা ইসহাক (রহ.)-এর অনুসারীরা প্রায় ৪০ বছর ধরে সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ধর্মীয় উৎসব পালন করে আসছেন।

ফরিদপুরের ১০ গ্রামে ঈদ

ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার শেখর ও রুপাপাত ইউনিয়নের অন্তত ১০ গ্রামের মানুষ বুধবার ঈদের নামাজ আদায় করেন। সহস্রাইল দায়রা শরীফ, রাখালতলি ও মাইটকুমরা মসজিদে চারটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

আলফাডাঙ্গা সরকারি ডিগ্রি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মাহিদুল হক বলেন, ‘চট্টগ্রামের মির্জাখিল শরীফ ও সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে বোয়ালমারীর শেখর ও রুপাপাত ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে একদিন আগে রোজা ও দুই ঈদ পালন করে আসছেন। এবারও চারটি জামায়াতে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে।’

ঝিনাইদহে তিন স্থানে জামাত

ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলায় চটকাবাড়িয়া, ভালকি ও নিত্যানন্দপুর গ্রামে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। চটকাবাড়িয়া গ্রামের মসজিদে প্রধান জামাতে ইমামতি করেন মাওলানা রেজাউল ইসলাম।

স্থানীয় সূত্র জানায়, উপজেলার প্রায় তিন শতাধিক পরিবার সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন করেছে।

বরগুনার ১৬ গ্রামে ঈদ উদযাপন

বরগুনার ১৬টি গ্রামে হযরত কাদেরিয়া চিশতিয়া তরিকা পন্থী ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের অনুসারীরা আগাম ঈদ পালন করেন। বেতাগীর বকুলতলী গ্রামে প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

বেতাগী মল্লিক বাড়ি জামে মসজিদ কমিটির সভাপতি গোলাম সরোয়ার আহসান বলেন, ‘সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে আমরা প্রতি বছর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উদযাপন করে থাকি। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও আমরা ঈদুল আজহা পালন করছি।’

স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১৫০ বছর ধরে এ অঞ্চলে এভাবে ঈদ পালনের প্রচলন রয়েছে।

সাতক্ষীরায় ২০ গ্রামের বেশি এলাকায় ঈদ

সাতক্ষীরার সদর, কলারোয়া ও পাইকগাছা উপজেলার ২০টির বেশি গ্রামের মানুষ আগাম ঈদ পালন করেন। সদর উপজেলার কুশখালী বাউকোলা এলাকায় প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

খুতবায় মাওলানা মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই তারা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা পালন করে আসছেন। এবারও সেই ধারাবাহিকতায় ঈদের নামাজ আদায় ও পশু কোরবানি করা হচ্ছে।’

রাজশাহীতে পাঁচ মুসল্লির জামাত

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার কৃষ্ণপুর মুসলিম জামে মসজিদে সীমিত পরিসরে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এতে নারী-পুরুষ মিলিয়ে পাঁচজন মুসল্লি অংশ নেন।

ইমাম রহিম গাজী বলেন, ‘মানুষ মনে করে সৌদি আরবের সাথে মিল রেখে ঈদ করছি, আসলে বিষয়টি তেমন নয়। চাঁদ কেবল বাংলাদেশ বা সৌদি আরবের জন্য উদিত হয় না; চাঁদ ওঠে পুরো পৃথিবীর জন্য। বৈজ্ঞানিক বা ভৌগোলিক কারণে সব দেশ থেকে একই সময়ে চাঁদ দেখা সম্ভব হয় না।’

ঝালকাঠিতে অর্ধশত পরিবারে উৎসব

ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার ডহরশংকর গ্রামে অর্ধশতাধিক পরিবার ঈদ উদযাপন করেছে। দারুস সুন্নাহ জামে মসজিদের ঈদগাহ মাঠে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক জামাতের আয়োজন করা হয়।

মসজিদের সভাপতি রিপন হাওলাদার বলেন, ‘২০১৩ সাল থেকে আমরা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে রোজা ও দুই ঈদ পালন করে আসছি। শুরুতে সমালোচনা থাকলেও এখন বিষয়টি স্বাভাবিক হয়ে গেছে।’

পটুয়াখালীর ৩৫ গ্রামে ঈদ

পটুয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলার ৩৫ গ্রামের প্রায় ২৫ হাজার মানুষ বুধবার ঈদ উদযাপন করেন। সদর উপজেলার বদরপুর দরবার শরীফে কেন্দ্রীয় জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

ঈদের জামাতে অংশ নেওয়া আমানুল ইসলাম লিটন বলেন, ‘আমরা আগে বাংলাদেশের নিয়মে ঈদ উদযাপন করলেও বর্তমানে বদরপুর দরবার শরীফের সাথে মিল রেখে ঈদ পালন করি। প্রায় ১০০ বছর ধরে এই নিয়মেই ঈদ পালন করেন এখানকার সবাই।’

বদরপুর দরবার শরীফের খতিব মাওলানা শফিকুল আলম গনি বলেন, ‘সর্ব প্রথম চাঁদ দেখার ভিত্তিতে ঈদে রোজাসহ ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করার নিয়ম বদরপুর দরবার শরীফে শুরু করেন ... এরপর থেকেই প্রায় ১০০ বছর ধরে আমরা এভাবেই ঈদ পালন করে আসছি।’

ভোলার ১০ গ্রামে একদিন আগে ঈদ

ভোলার সাত উপজেলার অন্তত ১০টি গ্রামে বিভিন্ন দরবারের অনুসারীরা ঈদ পালন করেন। বোরহানউদ্দিন উপজেলার মনিরাম ও মুলাইপত্তন গ্রামে বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

রাসেদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা একদিন আগে রোজা ও ঈদ পালন করি বিষয়টি এমন নয়- এটি ভৌগলিক কারণে আমরা একদিন আগেই পালন করি।’

নোয়াখালীর পাঁচ গ্রামে ঈদ

নোয়াখালীর সদর, কবিরহাট ও বেগমগঞ্জ উপজেলার পাঁচ গ্রামের মুসল্লিরা বুধবার ঈদুল আজহা উদযাপন করেন। জেলার ১০টি মসজিদে একযোগে জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

রশিদিয়া রহিমিয়া দরবার শরিফের ইমাম মোবারক হোসেন বলেন, ‘চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করেই রোজা ও ঈদ উদযাপন করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চাঁদ দেখা যাওয়ার ভিত্তিতে তারা সৌদি আরবের সঙ্গে মিল রেখে ঈদ পালন করছেন।’

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ফিকে ঈদ

এদিকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঈদের আনন্দ অনেকটাই ম্লান। খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় অধিকাংশ পরিবার কোরবানি দিতে পারছে না। অনেকের জন্য ঈদের দিনে সামান্য মাংস খাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।

ক্যাম্পের বাসিন্দা আবেদ উল্লাহ বলেন, ‘ঈদ উদযাপন এখন স্বপ্নের মতো। কিছু টাকা জোগাড় করতে পারলে হয়তো সামান্য গরুর মাংস কিনব, কিন্তু কোরবানি দেওয়ার কথা ভাবাও যায় না।’

স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক এনজিওর কর্মী নাজমুল হোসেন বলেন, ‘খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ার প্রভাব শুধু খাবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। শিশুদের পুষ্টিহীনতা, মানসিক চাপ এবং পরিবারগুলোর হতাশা দিন দিন বাড়ছে।’