২৫ মে ২০২৬, ১২:০৬

কোরবানির ঈদ এলেই চাঙা কামারশালা, বাকি সময় সংকটে

কামারশালায় কাজ করছেন একজন  © টিডিসি

লাল আগুনে দাউদাউ করে জ্বলছে চুল্লি। তার ভেতর থেকে বের করা তপ্ত লোহায় একের পর এক হাতুড়ির আঘাত। টুং টাং শব্দে যেন ছন্দ তুলেছে ফেনীর কামারপাড়া। কোরবানির ঈদ ঘনিয়ে আসতেই ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন জেলার বিভিন্ন এলাকার কামারশিল্পীরা। সকাল গড়ালে রাত, রাত পেরিয়ে ভোর। চলছে চাপাতি, দা, বঁটি ও ছুরি তৈরির কাজ। কেউ নতুন সরঞ্জাম বানাচ্ছেন, কেউ আবার পুরোনো জিনিসে শাণ দিয়ে ফিরিয়ে আনছেন ধার।

ফেনীর শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের ছোট ছোট কামারশালাগুলোয় এখন উপচে পড়া ভিড়। কোরবানির প্রস্তুতি নিতে সাধারণ মানুষ ছুটছেন কামারদের কাছে। কিন্তু এই ব্যস্ততা কেবল কয়েক দিনের। বছরের অন্য সময়টায় অনেকটা নিভু নিভু অবস্থায় কাটে তাদের জীবন ও জীবিকা।

জানা গেছে, একসময় অগ্রহায়ণ আর পৌষ মাস এলেই গ্রামবাংলার বাতাসে ভেসে আসত লোহা পেটানোর শব্দ। কৃষকের ধান কাটার কাস্তে বানাতে তখন দম ফেলার সময় পেতেন না কামাররা। কৃষিভিত্তিক জনপদের অপরিহার্য অংশ ছিলেন তারা। কিন্তু আধুনিক যন্ত্রপাতির দাপটে সেই চিত্র এখন প্রায় হারিয়ে গেছে। মেশিনে তৈরি সস্তা পণ্যের ভিড়ে দিন দিন কমছে হাতে গড়া দেশীয় লোহার সরঞ্জামের কদর।

সোমবার (২৫ মে) সরেজমিনে শহরের ট্রাংক রোডস্থ একটি কামারশালায় দেখা যায়, ছোট্ট একটি দোকানের ভেতরে একজন কামার আগুনে তপ্ত লোহা পিটিয়ে তৈরি করছেন চাপাতি। পাশে দুইজন পুরোনো দা ও বঁটি শাণ দিচ্ছেন। 

কামারশালায় কথা বলে জানা যায়, একটি সাধারণ দা তৈরি করতে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা, বড় চাপাতি ৮০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, বঁটি ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা এবং ছুরি ২০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া পুরোনো দা, বঁটি বা ছুরিতে শাণ দিতে আকারভেদে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন কামাররা।

কামারশিল্পীরা জানান, আগে সারা বছরই কাজ থাকলেও এখন কোরবানির ঈদ ছাড়া তেমন আয় হয় না। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও আধুনিক কারখানার তৈরি পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তবু বাপ-দাদার পেশা ধরে রাখতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

কামারদের দেওয়া তথ্যমতে, এক সময়ের জমজমাট কামার শিল্প এখন ফেনী শহরে সংকুচিত হয়ে এসেছে মাত্র ৪০টিরও কম দোকানে। শহরের মহিপাল, লালপোল, সহদেবপুর, মাস্টারপাড়া, পাঁছগাছিয়া, বারাহিপুর ও খাজুরিয়া সড়কে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এসব কামারশালা। এ পেশার সঙ্গে শহরে এখনো জড়িত রয়েছেন ৫০ জনের মতো কামার শিল্পী। তবে এ পেশার জড়িত অনেকেই ঝুঁকছেন অন্য পেশায়।

কামারশিল্পী হরিদাস কর্মকার বলেন, একটি দা ৪০০–৮০০ টাকা, চাপাতি ১ হাজার–১ হাজার ৫০০ টাকা, বঁটি ৫০০–১ হাজার টাকা এবং ছুরি ২০০–৬০০ টাকায় বিক্রি হয়। শাণ দিতে ৫০–২০০ টাকা লাগে। কিন্তু কয়লা, লোহাসহ সব কাঁচামালের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় আয় খুবই কমে গেছে। আগের ৬০০-৭০০ টাকার কয়লা এখন ৩ হাজার টাকার বেশি দামে কিনতে হচ্ছে।

পলাশ কর্মকার নামে আরেক কামারশিল্পী বলেন, কোরবানির সময়টাতে কাজের চাপ বাড়ে ঠিকই, কিন্তু সারাবছর কাজ থাকে না বললেই চলে। আধুনিক মেশিনে তৈরি সস্তা পণ্যের কারণে আমাদের হাতে বানানো জিনিসের চাহিদা কমে গেছে। তবুও বাপ-দাদার পেশা ছাড়তে পারছি না।

কামারশিল্পী নারায়ণ কর্মকার বলেন, লোহার দাম, কয়লার দামসহ সব কাঁচামালের খরচ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ। আগের মতো লাভ থাকে না। অনেক সময় দিনভর কাজ করেও দোকান ভাড়া আর সংসারের খরচ ওঠে না। তাই অনেকেই এই পেশা ছেড়ে অন্য কাজে চলে যাচ্ছে।

দীপক দাস নামে অপর এক কামারশিল্পী বলেন, আমরা চেষ্টা করছি টিকে থাকতে। ঈদকে কেন্দ্র করে কিছুটা আয় হলেও সেটা সারা বছরের জন্য যথেষ্ট না। যদি সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাওয়া যেত, তাহলে এই ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্পটা হয়তো বাঁচিয়ে রাখা যেত।

ছুরি ও বঁটিতে শান দিতে আসা মোহাম্মদ কামাল জানান, গত বছরের কোরবানিতে ব্যবহার করা ছুরি ও বঁটি এবার আবার শান দিতে এনেছেন। এ বছর এসব সরঞ্জামের দাম বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে কেনার বদলে পুরোনোগুলো শান দিয়ে ব্যবহার করতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ক্রেতা রবিউল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর কোরবানির আগে এখান থেকেই দা, বঁটি, চাপাতি কিনি। হাতের তৈরি জিনিসের ধার ভালো থাকে, তাই ভরসা করি। তবে এবার দাম আগের তুলনায় কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে।

আরেক ক্রেতা সাইফুল ইসলাম বলেন, ফ্যাক্টরির তৈরি জিনিসও পাওয়া যায়, কিন্তু কামারদের বানানো জিনিসে আলাদা একটা মজবুতি আছে। তাই এখানেই আসি। তবে কামারদের অবস্থা দেখলে খারাপ লাগে, তারা খুব কষ্টে আছেন।

দা, ছুরি ও চাপাতি বিক্রির ধুম
ঈদুল আজহার আর মাত্র দুই দিন বাকি। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে এখন ব্যস্ত ফেনীর মানুষ। কেউ পশু কিনে ফেলেছেন, আবার কেউ এখনো পছন্দের পশুর খোঁজে ছুটছেন। সেই ব্যস্ততার মাঝেই কোরবানির প্রয়োজনীয় দা, বঁটি, ছুরি, চাপাতি কিনতে শহরের বাজারগুলোতে দেখা যাচ্ছে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড়।

সোমবার (২৫ মে) সরেজমিনে শহরের রাজাঝির দিঘীর পাড়, বড় বাজার, পৌর হকার্স মার্কেটসহ বিভিন্ন ভ্রাম্যমাণ দোকান ও ফুটপাতে ঘুরে দেখা যায়—দা, বঁটি, ছুরি ও চাপাতি বিক্রির দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ব্যাপক ভিড়। সকাল থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত চলছে কেনাবেচা। ক্রেতারা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী ধারালো দা, মাংস কাটার ছুরি এবং চাপাতি বেছে নিচ্ছেন।

বিক্রেতারা জানান, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে এই সময়টিতে বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তে চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, ফলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা কাজ করতে হচ্ছে তাদের।

ক্রেতারাও বলছেন, কোরবানির পশু জবাই ও মাংস কাটার জন্য ভালো মানের দা-ছুরি না হলে কাজ করতে সমস্যা হয়। তাই অনেকেই আগেভাগেই বাজারে এসে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহ করছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টদের সূত্রে জানা গেছে, শেষ দুই দিনে এই বিক্রি আরও বাড়বে। 

শহরের বিভিন্ন বাজারের দোকানিদের সূত্রে জানা যায়, লোহার বাটযুক্ত দা ও কাঠের বাটযুক্ত দা এবং  বঁটি দা বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকা থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকায়। পশুর চামড়া আলাদা করার ছোট ছুরি ৫০ টাকা থেকে ৮০ টাকা, মাঝারি ৫০ টাকা থেকে ৯০ টাকা এবং বড় ছুরি ৮০ টাকা থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এছাড়া লম্বা ছুরি ২০০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা, জবাই করার ছুরি ২৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা, চাপাতি সাড়ে ৩৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকা। 

মৌসুমী ব্যবসায়ী আবদুল মোতালেব বলেন, আগে কামারদের তৈরি দা, ছুরি ও চাপাতির চাহিদা ভালো ছিল। এখন মানুষ বেশি ঝুঁকছে স্টিলের তৈরি কারখানার পণ্যের দিকে।

কামাল হোসেন নামের এক দোকানি বলেন, ঈদ এলেই আমাদের বেচাকেনা বেড়ে যায়।কয়েক দিন ধরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটানা বিক্রি হচ্ছে। এবার আগের বছরের তুলনায় ক্রেতার চাপ একটু বেশি।

পৌর হকার্স মার্কেটের মৌসুমী ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সারা বছর অপেক্ষা করি এই সময়টার জন্য। ভালো মানের দা ও ছুরির চাহিদা বেশি। অনেকেই একসঙ্গে একাধিক জিনিস কিনছেন।’

আরিফুল হক নামে আরেক ক্রেতা বলেন, ‘বাড়িতে কোরবানি দেওয়ার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে আমাকে সরঞ্জাম কেনার বাজারে পাঠিয়েছে। বিভিন্ন দোকান ঘুরে মান অনুযায়ী সরঞ্জাম কিনেছি।’

শহরের নাজির রোড এলাকার বাসিন্দা গৃহিণী সালমা আক্তার বলেন, ‘প্রতিবছরই ঈদের আগে আমরা নতুন দা-ছুরি কিনি। বাসায় কোরবানি দিলে মাংস কাটার কাজটা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে যায়। তাই যেন কোনো ঝামেলা না হয়, সে জন্য দোকান ঘুরে দেখে, যাচাই করে ভালো মানের চাপাতি ও ছুরি নিয়েছি।’