সুন্দরবনে গুলিতে জেলে নিহত, পরিবারকে সহযোগিতার আশ্বাস বন প্রতিমন্ত্রীর
সুন্দরবনের নিষিদ্ধ অভয়ারণ্য এলাকায় কাঁকড়া ধরার সময় বন বিভাগের সদস্যদের গুলিতে জেলে আমিনুর রহমান গাজী (৪৫) নিহতের ঘটনায় সাতক্ষীরার শ্যামনগরে চরম উত্তেজনা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল বিকেলে বিক্ষুব্ধ জনতা বন বিভাগের অফিসে ব্যাপক হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছেন। এ ঘটনায় নিহত জেলের বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন সরকারের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
মঙ্গলবার (১৯ মে) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে শ্যামনগর উপজেলা বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সোরা গ্রামে নিহত জেলের বাড়িতে যান। এ সময় ড. মনিরুজ্জামানের মাধ্যমে ভার্চুয়ালী যুক্ত হয়ে নিহত পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং সান্ত্বনা দেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘সুন্দরবনে জেলে নিহতের এ ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। এ ঘটনায় একটি সঠিক ও নিরপেক্ষ তদন্ত করা হবে এবং প্রকৃত দোষীদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’
নিহত আমিনুর রহমান গাজী ৫টি সন্তান রেখে গেছেন। আজ নিহতের বাড়িতে গিয়ে ড. মনিরুজ্জামান বিএনপির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করেন এবং সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পাশে থাকার অঙ্গীকার করেন।
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ড. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘একটি সাধারণ পাস নিয়ে বনে যাওয়া অসহায় জেলের বুকে এভাবে গুলি চালানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা বিএনপির পক্ষ থেকে এই শোকাবহ পরিবারের পাশে আছি। আজকে আমরা তাদের আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছি এবং নিহত আমিনুরের অসহায় ৫টি এতিম সন্তানের পাশে থাকার ও তাদের দেখভালের অঙ্গীকার করছি।’
এদিকে দুপুর ১২টার দিকে নিহতের পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে এবং সহায়তা করতে আসে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর একটি প্রতিনিধিদল। শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আবদুর রহমান নিহতের পরিবারকে জামায়াতের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতা তুলে দেয়।
শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুর রহমান বলেন, ‘পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে এই পরিবারটি আজ দিশেহারা। জামায়াতে ইসলামী সবসময় মজলুমের পাশে থাকে। আমরা আজ এই অসহায় পরিবারটিকে আর্থিক সহযোগিতা করেছি এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এই ৫ এতিম সন্তানের দায়িত্ব নিয়ে সবসময় পরিবারের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, গত ১৩ মে সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী স্টেশন থেকে পাস নিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করেছিলেন আমিনুরসহ ৪ জেলে। সোমবার সকাল ৭টার দিকে খুলনা রেঞ্জের নলিয়ান স্টেশনের পাটকোস্টা হেলাবাসী অভয়ারণ্য এলাকায় কাঁকড়া আহরণের সময় বনবিভাগের স্মার্ট পেট্রোলিং টিমের সদস্যরা তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে আমিনুর রহমান গাজী ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এই ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি ও চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।
পরে সোমবার (১৮ মে) বিকেলে নিহত জেলে আমিনুর রহমানের মরদেহ নিয়ে শত শত বিক্ষুব্ধ বনজীবী ও স্থানীয় বাসিন্দা লাঠিসোঁটা হাতে শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী এলাকায় বনবিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জ অফিস ও পাশের স্টেশন অফিসে চড়াও হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষুব্ধ জনতা বনবিভাগের কর্মীদের খুঁজে খুঁজে মারধর করে এবং অফিস ভবনসহ ভেতরের আসবাব ভাঙচুর করে। এ হামলায় বনকর্মী তপন, মেজবাহ, ফারুক, এখলাছুর ও ফায়জুর মারাত্মক জখম হন। খবর পেয়ে বিজিবি ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আহতদের উদ্ধার করে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালেদুর রহমান জানান, সুন্দরবনে গুলিতে জেলে নিহত এবং পরবর্তীতে বনবিভাগের অফিসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে এই পৃথক দুটি ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো পক্ষই থানায় লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের করেনি। ঊর্ধ্বর্তন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা ও সিদ্ধান্তের আলোকে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম মাছুদুল আলম বলেন, ‘নিহত জেলে আমিনুর রহমানের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। সেখানে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শেষ করে মরদেহ আজ বিকেলে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হবে। এরপর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হতে পারে। পুরো গাবুরা ইউনিয়নে এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আমরা প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি।’