১৬ মে ২০২৬, ১৫:৫৭

দালাল চক্রের নিয়ন্ত্রণে ভূমি অফিস, তদবিরে অতিষ্ঠ ভূমিকর্তারা

আনোয়ারা উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ের ফটক  © সংগৃহীত

আনোয়ারা উপজেলা ভূমি অফিস একটি বড় দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দালাল চক্রের দৌরাত্ম্যে রীতিমতো ত্যাক্ত-বিরক্ত সেবা গ্রহীতারা। ভূমি অফিসে দখলে রেখে নিয়মিত মানুষকে হয়রানি করে যাচ্ছে চক্রটি। শুধু সেবা প্রত্যাশীরাই নয়, খোদ কর্মকর্তাও দালালের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ বলে জানিয়েছে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন ও দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দালাল চক্রের সদস্যরা নামজারি, মিস মামলা, খাজনা আদায়সহ বিভিন্ন কাজে অন্যায় তদবির করতে আসেন। অনেকেই ভূমি অধিগ্রহণ, খাসজমি, আদালতের চলমান মামলা জটিলতার নিষেধাজ্ঞা থাকা ও ১৯৬৯ সালের দলিলসহ জাল দলিল নিয়ে আসেন নামজারি করানোর জন্য। তাদের এসব তদবির রাখার জন্য অনেক সময় ক্ষমতা প্রয়োগ এবং দালালদের সহায়তাও নেন তারা। এমনকি হুমকি ও হেনস্তার ঘটনাও ঘটে ভূমি অফিসে। তাদের এসব তদবিরে অতিষ্ঠ ভূমি কর্তারাও। অন্যায় তদবিরের চাপে হাঁপিয়ে উঠছেন কর্মকর্তারা।

এ ছাড়া সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ভূমি অফিসে দখলে রেখে নিয়মিত মানুষকে হয়রানি করে যাচ্ছে চক্রটি। এদের খপ্পর থেকে রেহাই পাচ্ছে না প্রান্তিক ভূমিসেবা প্রার্থীরা। শুধু সেবাপ্রত্যাশীরাই নয়, খোদ কর্মকর্তাও তদবির ও দালালের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ঠিকমতো কাজ করতে পারছেন না বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তর এসব তথ্য জানিয়েছে।

এদিকে সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (ডিএলআরএস) গত কয়েক বছরে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় নিয়ে এসেছে।

ফলে অনলাইনে নামজারি আবেদন, ই-নামজারি নিষ্পত্তি, ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ, অভিযোগ দাখিল এবং ভূমিসংক্রান্ত তথ্য যাচাই সবকিছুই এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে করা যাচ্ছে। অটোমেশনের ফলে জনগণকে ভূমি সেবার পেতে এখন আর সরাসরি ভূমি অফিসে যেতে হয় না। ঘরে বসে বা অনলাইনেই এই সেবা পাওয়া যাচ্ছে। এতে দুর্নীতি যেমন কমেছে, সেবা প্রাপ্তিও সহজতর হচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে মানুষজনকেও আরও সচেতন হতে হবে। নয়তো মধ্যস্বত্বভোগীর দৌরাত্ম্য কমানো কঠিন হবে মনে করছেন ভূমি কর্মকর্তারা।

সেবা নিতে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খতিয়ান, নামজারি, দিয়ারা সংশোধনী ও ভূমিসংক্রান্ত মামলাসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ডিঙ্গিয়ে দালালদের নিকট যান সহজে করার জন্য। এতে দালালরাও টাকা নিয়ে প্রতারণা করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সেলিম উদ্দিন বলেন, ‘অনেকেই ত্রুটিপূর্ণ কাজ টাকার বিনিময়ে আদায় করতে ব্যর্থ  হচ্ছেন। কাগজপত্রের ত্রুটির কারণে কাজ গুলো করতে ভূমি কর্তারা অপারগতা প্রকাশ করলে ঘটে ক্ষমতা প্রয়োগসহ হুমকির ঘটনা।’

অভিযোগ উঠেছে, তদন্ত প্রতিবেদনসহ জমি সরেজমিনেও বিপাকে পড়তে হয় কর্মকর্তাদের। নামজারি আবেদন প্রক্রিয়ায় দখল না থাকা জমিও দখল প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ক্ষমতা প্রয়োগ করেন অনেকেই। প্রতিবেদন পক্ষে না গেলে অফিসে এসে হুমকিসহ হেনস্তার শিকার হতে হয় অনেক সময়।

জানা গেছে, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দীপক ত্রিপুরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভূমি অফিসে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। প্রতিদিন অফিসের বিভিন্ন কার্যক্রম তদারকি করছেন তিনি। সেবা নিতে আসা মানুষদের অনেক সময় নিজেই ডেকে তাদের সমস্যার কথা শুনছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আস্থা ও স্বস্তি।

স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে ভূমি অফিসে দালাল ছাড়া কাজ করা কঠিন ছিল। ছোট একটি কাজ করতেও ভোগান্তি পোহাতে হতো সাধারণ মানুষকে। এখন অনেকেই সরাসরি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে সমাধান পাচ্ছেন। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা বিভিন্ন জটিল নামজারি ও ভূমিসংক্রান্ত মামলার নিষ্পত্তিও দ্রুত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সেবাগ্রহীতারা।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) দীপক ত্রিপুরা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, পুরো অফিস ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার আওতায় এনে কঠোর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে দালালমুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। ভূমি অফিসে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্যেও নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সেবাপ্রত্যাশীদের সরাসরি আমার অফিসে আসতে উৎসাহ দিচ্ছি। অন্য কারো হাত দিয়ে আসা মানেই সেখানে দালাল ঢুকে পড়া। ফলে এখন সেবা গ্রহীতারা সরাসরি আমার অফিসে আসতে পারছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘ইতিমধ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন দখলে থাকা বেশ কয়েকটি সরকারি খাসজমি উদ্ধার করা হয়েছে। এসব উদ্ধারের পর থেকে তারা দালাল চক্রসহ বিভিন্ন অন্যায় তদবির করছেন। আমরা তাদেরও চিহ্নিত করে রাখছি এবং তাদের বিষয়ে কতৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।’