০৩ মে ২০২৬, ১৯:৩৯

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বাড়ছে হামের প্রাদুর্ভাব

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির  © টিডিসি ফটো

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। সেখানে ৩৩০ জনের বেশি মানুষের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এ ছাড়া পরীক্ষায় ৪০ জনের মধ্যে রোগটি শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে তিনজনের। আশপাশের স্থানীয় জনগোষ্ঠীতেও প্রায় ১৬০ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এতে ক্যাম্পের বাইরে রোগটি ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা বাড়ছে।

হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকায় কক্সবাজারে নিজেদের চিকিৎসা কার্যক্রম জোরদার করেছে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাসেবা সংস্থা মেডিসিনস স্যান্স ফ্রন্টিয়ার্স (এমএসএফ)। সংস্থাটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি চলমান টিকাদান কর্মসূচিতেও সহায়তা করছে।

গত ৩০ এপ্রিল এক বার্তায় এমএসএফ এসব তথ্য জানায়।

এমএসএফ জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বাংলাদেশের ৬৪ জেলাতেই হামের সংক্রমণ বেড়েছে। কক্সবাজারের বিশ্বের বৃহত্তম রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ১২ লাখের বেশি মানুষের বসবাস এবং ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি আরো বেড়েছে।

হেলথ সেক্টরের তথ্যমতে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ৩৩০ জনের বেশি সম্ভাব্য এবং ৪০ জন নিশ্চিত হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যেও প্রায় ১৬০ জন আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে।

এমএসএফের কান্ট্রি মেডিকেল কো-অর্ডিনেটর মিকে স্টেনসেন্স বলেন, চলতি বছরের শুরু থেকে জেলায় নিয়মিত হামের সংক্রমণ দেখা গেলেও মার্চ থেকে তা ব্যাপক আকার ধারণ করে এবং এপ্রিলে আরো বেড়ে যায়।

তিনি জানান, আক্রান্তদের অধিকাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু এবং অনেকের মধ্যে গুরুতর নিউমোনিয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। শুধু এপ্রিল মাসেই এমএসএফ কক্সবাজারের বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে ২৮৪ জন হামে আক্রান্ত রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে, যা বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় চার গুণ বেশি। এর মধ্যে ৮২ জনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে।

মিকে স্টেনসেন্স আরো বলেন, ১৯ এপ্রিল জামতলী ক্যাম্পে একটি নতুন আইসোলেশন ইউনিট চালু করা হয়েছে, যা সব ক্যাম্পের জন্য রেফারেল সেন্টার হিসেবে কাজ করছে। ইউনিটটি ইতোমধ্যে পূর্ণ সক্ষমতায় পৌঁছেছে এবং শয্যাসংখ্যা দ্বিগুণ করার প্রস্তুতি চলছে।

এমএসএফ জানায়, গয়ালমারা মা ও শিশু হাসপাতালে হামে আক্রান্ত রোগীর ৪০ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হয়েছে। অন্যদিকে কুতুপালং হাসপাতালে ২০ দিনের ব্যবধানে ভর্তি হওয়া ৭১ জন রোগীর মধ্যে ১৫ জনকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

সংস্থাটি বলছে, ক্যাম্পের মানবেতর জীবনযাত্রা শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দিলেও বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো টিকাদানের নিম্ন হার। ক্যাম্পে শনাক্ত হওয়া ল্যাবরেটরি-নিশ্চিত রোগীদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই টিকা নেয়নি।

প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনতে ২৬ এপ্রিল থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে শুরু হয় হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি।

মিকে স্টেনসেন্স বলেন, হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর ও নিরাপদ টিকার দুটি ডোজ প্রয়োজন। তবে প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে, যা বর্তমানে ক্যাম্প ও আশপাশের এলাকাগুলোতে অনেক কম।

বর্তমানে এমএসএফ জামতলী ও হাকিমপাড়া প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ‘হসপিটাল অন দ্য হিল’, কুতুপালং হাসপাতাল এবং গয়ালমারা মা ও শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে হামে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে।

সংস্থাটি জানায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ যুক্ত বা নিশ্চিত হওয়া ৩৫০ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে ১০৩ জনের শারীরিক জটিলতা ছিল।

এদিকে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় (৩ মে ) কক্সবাজারে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও এক রোহিঙ্গা শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে জেলায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ জনে। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ১৩২ জন রোগী।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং নিয়মিত টিকাদান ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।