‘কাজ পেলে দিন ভালো যায় , না পেলে খালি পেটে থাকতে হয়’
মে দিবস কী জানি না, আমাদের সব দিনই সমান। প্রতিদিন আমাদের কাজে আসতে হয়। কাজ পেলে দিন ভালো, না পেলে খালি পেটে থাকতে হয়। ভোরের আলো ফুটতেই ফেনী শহরের ট্রাংক রোডের খেজুর চত্বরে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রাম থেকে আসা দিনমজুর রহমত উল্লাহ।
তিনি বলেন, সকালে এখানে দাঁড়াই, কেউ ডাকলে যাই, না ডাকলে খালি হাতে ফিরি। দিন গেলে টাকা, না হলে কিছুই নাই এইভাবেই চলতেছে জীবন।
রহমত উল্লাহর মতো শত শত শ্রমিক প্রতিদিন এখানে ভিড় করেন। কেউ ইটভাটার কাজের আশায়, কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউবা দিন আনে দিন খায় জীবনের নিরব সাক্ষী হয়ে। সূর্য ওঠার আগেই তাদের অপেক্ষা শুরু হয়, আর বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে অনিশ্চয়তা। কেউ কাজ পায়, কেউ ফিরে যায় খালি হাতে। এখানে মানুষই যেন পণ্য, আর দরাদরির মধ্যেই নির্ধারিত হয় তাদের দিনের ভাগ্য।
শুক্রবার (১ মে) সরেজমিনে দেখা যায়, কাস্তে-কোদাল, ঝুড়ি ও পুরনো কাপড়ের ঝোলা নিয়ে ভোর থেকেই হাজির হন শ্রমিকরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
ফেনী শহরের ট্রাংক রোডস্থ খেজুর চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে বসছে এই শ্রমিকের হাট। এখানে প্রতিদিন অন্তত ৪০০ থেকে ৫০০ শ্রমিক কাজের আশায় অপেক্ষা করেন। তাদের অনেকেই জানেন না মে দিবস কী, কিংবা শ্রমিকের অধিকার বলতে কী বোঝায়। তবুও পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে প্রতিদিনই তারা এই হাটে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন
শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, দেশের উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা এবং নোয়াখালীর চরাঞ্চল থেকে আসা শ্রমিকরাই এখানে বেশি। নিজ এলাকায় কাজের অভাব, নদীভাঙন ও দ্রব্যমূল্যের চাপে তারা পাড়ি জমিয়েছেন ফেনীতে। প্রতিদিন ভোর ৫টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত চলে শ্রম কেনাবেচা। ক্রেতারা এসে দরদাম করে শ্রমিক নিয়ে যান। কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরি নির্ধারিত হয় ৫০০ থেকে ৮০০ টাকার মধ্যে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, কাজের জন্য দরদাম হলেও তা অধিকাংশ সময় ন্যায্য হয় না। ঠিকাদার বা কাজদাতারা নিজেদের সুবিধামতো মজুরি নির্ধারণ করেন, ফলে শ্রমের তুলনায় পারিশ্রমিক কম পান তারা। অনেক ক্ষেত্রে দর কষাকষির সুযোগও থাকে না—কাজ পাওয়ার তাড়নায় কম মজুরিতেই রাজি হতে বাধ্য হন শ্রমিকরা।
গাইবান্ধার শ্রমিক মোহাম্মদ আলী বলেন, “কাজে নেওয়ার সময় এক কথা কয়, কাজ শেষে আরেক কথা। অনেক সময় ঠিকমতো টাকাও দেয় না। কিছু বললে পরের দিন আর ডাকে না।”
রংপুরের হাশেম মিয়া বলেন, “১০-১২ ঘণ্টা কাজ করায়, কিন্তু মজুরি ৭০০ টাকা। এর মধ্যে নিজের দুই বেলা খাবারের জন্য ২০০ টাকা চলে যায়। বাকি ৫০০ টাকা বাড়িতে পাঠাই। এ টাকায় কিছুই হয় না।”
ফেনীতে ২২ বছর ধরে শ্রমিক হিসেবে কাজ করা বরিশালের আবুল কালাম বলেন, “আমাদের এলাকায় কাজের সুযোগ কম, আর কাজ থাকলেও মজুরি খুবই কম। তাই বেশি আয়ের আশায় ফেনীতে আসি। একসময় ৬০ টাকায় দিনমজুরির কাজ করেছি, এখন ৭–৮শ টাকা পাই। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের চাপে এই আয়েও সংসার চলে না।”
ভোলার কৃষক মো. আলম বলেন, “মে দিবস পালনের নামে সরকার কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে, আর আমরা কৃষক-শ্রমিক না খেয়ে মরি। আমাদের খোঁজ কেউ রাখে না। কৃষক-শ্রমিক না বাঁচলে এসব দিবস দিয়ে কী হবে?”
বাদশা মিয়া নামে আরেক শ্রমিক বলেন, “শ্রমিকের দুঃখ কেউ বোঝে না। পরিবারের মুখে দুমুঠো ভাত তুলে দিতে আমরা কাজ করি। গায়ে-গতরে খেটে যতটুকু আয় করি, তাতেই সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করি। মে দিবস নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।”
মোশাররফ হোসেন নামের ফেনীর এক বাসিন্দা বলেন, “ধান কাটার জন্য ছয়জন শ্রমিক নিতে এখানে এসেছি। প্রতিদিন ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত এখানে বিভিন্ন বয়সী শ্রমিক পাওয়া যায়। অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি, কিন্তু দাম একটু বেশি চাওয়ায় এখনও কাউকে নিইনি।”
শাহ আলম নামের আরেক বাসিন্দা বলেন, “চাকরির সুবাদে ঢাকায় থাকি। আজ সকালে ফেনীতে এসেছি। বাড়িতে মাটি কাটার জন্য দুইজন শ্রমিক লাগবে, তাই সরাসরি ট্রাংক রোডে চলে এসেছি।”