৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞায় কক্সবাজারে জেলেপল্লিতে হাহাকার
কক্সবাজারের উপকূলজুড়ে এখন সমুদ্রের ঢেউ আছে, কিন্তু নেই জেলেদের ব্যস্ততা। ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা, শুকিয়ে যাচ্ছে জাল, আর জেলে পরিবারগুলোর ঘরে চলছে টিকে থাকার হিসাব। সেই হিসাবের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন একটি প্রশ্ন ৭৭ কেজি চাল দিয়ে কীভাবে চলবে ৫৮ দিন?
প্রতিবছরের মতো এবারও সামুদ্রিক মাছের প্রজনন, মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণ এবং সাগরের ভারসাম্য রক্ষায় সরকার ৫৮ দিনের জন্য সমুদ্রে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে। পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ মৎস্যসম্পদের জন্য এ সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে উপকূলের হাজারো জেলে পরিবারের জীবনে। কারণ সমুদ্রই তাদের একমাত্র আয়ের উৎস।
নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার পর থেকেই জেলেরা কার্যত বেকার সময় পার করছেন। নৌকা নিয়ে সাগরে যেতে পারছেন না, মাছ ধরতে পারছেন না, বাজারে বিক্রি করার মতো আয়ও নেই। ফলে পরিবার চালাতে সরকারি খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন তারা।
সরকারের পক্ষ থেকে নিবন্ধিত জেলেদের জন্য ৭৭ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু জেলেদের অভিযোগ, এত দীর্ঘ সময়ের জন্য এই সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। তাদের ভাষায়, শুধু চাল দিয়ে সংসার চলে না। আবার এই বরাদ্দের চাল পেতেও উপজেলা মৎস্য অফিস থেকে শুরু করে ধন্না দিতে হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাদের কাছে। আবার কিছু জেলে কার্ড থাকা সত্ত্বেও এবার চাল পাননি বলে শোনা গেছে।
জেলে আবুল কাশেম বলেন, ‘চাল দিয়ে ভাত হবে ঠিকই, কিন্তু তরকারি কোথা থেকে আসবে? বাচ্চাদের স্কুলের খরচ কে দেবে? অসুস্থ বাবা-মায়ের ওষুধ কীভাবে কিনবো?’
আরেক জেলে আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা মাছ ধরে দেশের মানুষের খাবার জোগাই, অথচ আজ নিজেদের ঘরেই খাবারের সংকট।’
জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৬৪ হাজার ৪২৮ জন। এর মধ্যে ৬৪ হাজার ২৩ জন জেলে সরকারি খাদ্য সহায়তা পাচ্ছেন। বাকি ৪০৫ জন নদীতে মাছ ধরেন বলে তারা এ তালিকার বাইরে রয়েছেন।
এ বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, আগেরবার কিছু অনিয়মের অভিযোগ থাকায় এবার পুরনো তালিকা, নতুন অনলাইন নিবন্ধন এবং প্রকৃত জেলে শনাক্ত করেই সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা বলছে, চাল পেলেও সংকট কাটছে না। কারণ জেলেদের জীবন শুধু খাদ্যের ওপর নির্ভর করে না। তাদের রয়েছে ঋণ, কিস্তি, চিকিৎসা ব্যয়, সন্তানের পড়ালেখা, নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারসহ অসংখ্য দায়-দায়িত্ব।
উপকূলের মানুষের ভাষায়, ‘সমুদ্র বন্ধ মানে শুধু মাছ ধরা বন্ধ নয়, জীবনও থেমে যাওয়া।’
৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা হয়তো সাগরের মাছের জন্য আশীর্বাদ হলেও উপকূলের হাজারো পরিবারের জন্য এই সময় হয়ে উঠেছে চরম অনিশ্চয়তা ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের নাম।
জেলেদের দাবি, শুধু চাল দিয়ে নয় নগদ সহায়তা, চিকিৎসা সুবিধা, বিকল্প কর্মসংস্থান এবং বাস্তবসম্মত সহায়তা প্যাকেজের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। কারণ যারা সমুদ্রে জীবন বাজি রেখে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, দুর্দিনে তাদেরও বাঁচার অধিকার আছে।