৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৬:৫৯

টানা বৃষ্টি ও শ্রমিকসংকটে বিপাকে গাইবান্ধার কৃষকরা

বোরো ধান কাটেছেন কৃষিশ্রমিকরা  © টিডিসি

গাইবান্ধার বিস্তীর্ণ মাঠ এখন পানির নিচে। টানা কয়েক দিনের বর্ষণে জেলার নিম্নাঞ্চলের শত শত হেক্টর জমির আধা পাকা বোরো ধান তলিয়ে গেছে। বাতাসে লুটিয়ে পড়া ধান দেখে দিশেহারা কৃষকেরা। তার ওপর তীব্র শ্রমিকসংকট ও মজুরির অস্বাভাবিক হেরফের পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।

জেলা কৃষি অফিস সূত্র জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে গাইবান্ধায় ১ লাখ ২৯ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে কেবল কয়েকদিনের বৃষ্টিতেই ২১২ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে গেছে। বিশেষ করে সদর, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী ও সুন্দরগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সরেজমিনে বাদিয়াখালী, চকবরুল, হরিণাবাড়ী, বেতকাপা, তুলসীঘাটের মাঠ ঘুরে দেখা গেছে—ধানক্ষেত যেন এক বিস্তীর্ণ জলাশয়। পাটোয়ারগঙ্গা, হরিণাবিল, পুরানদহের অবস্থাও একই রকম। পলাশবাড়ীর রাইতিনরাইল, নান্দিশহর বিল, মালিয়ানদহ, খামার নান্দিশহর, পকুরিয়া বিল, মাঠেরবাজার, কুমারগাড়ী এবং সুন্দরগঞ্জের তারাপুর, হরিপুরের নিচু এলাকাগুলোতেও পানি জমে ধান ডুবে আছে।

পলাশবাড়ী উপজেলার হরিণাবাড়ী গ্রামের সোলাগাড়ি বিলের চিত্রটি সবচেয়ে করুণ। প্রায় ৫০০ বিঘা জমির ধান পানির নিচে। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, আগে এই বিলের পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি নালা ছিল। কিন্তু কয়েক বছর আগে সেখানে একটি ইটভাটা নির্মাণ করা হলে নালাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এখন পানি বের হওয়ার কোনো পথ না থাকায় পুরো বিল জলমগ্ন।

জলাবদ্ধতার মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে শ্রমিক সংকটে। মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই শ্রমিকপ্রতি মজুরি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। আর জমিতে পানি থাকায় এখন বিঘাপ্রতি মজুরি গিয়ে ঠেকেছে সাত থেকে আট হাজার টাকায়। আগে যেখানে তিন-চার হাজার টাকায় এক বিঘা জমির ধান কাটা যেত, সেখানে এখন সেই খরচ দ্বিগুণের বেশি।

হরিণাবাড়ী গ্রামের কৃষক মিন্টু মিয়া বলেন, ‘আগে এক বিঘা জমির ধান কাটতে তিন-চার হাজার টাকা লাগত, এখন লাগছে সাত-আট হাজার টাকা। টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।’ তিনি জানান, তার প্রায় ৪০ শতক জমির ধান ইতিমধ্যে পানিতে লুটিয়ে পড়েছে।

গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সোনাইডাঙ্গা গ্রামের কৃষক ময়েন উদ্দিন আকন্দের কণ্ঠে এক বাস্তবিক আশঙ্কা ধ্বনিত হয়েছে, ‘আবহাওয়া এতটাই খারাপ যে বজ্রপাতের ভয়ে খেতে যেতে পারছি না। জীবনের আগে তো আর ধান না।’

অনেক জমিতে কেটে আনা ধানেও পানি জমে থাকছে। তীব্র রোদের অভাবে এসব ধান থেকে চারা বের হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। খড়ও পচে যাচ্ছে।

নান্দিশহর গ্রামের ইজিবাইকচালক জাফিরুল বলেন, ‘কষ্টের ফসল চোখের সামনে জমির পানিতে পচে যাবে। ঋণ করে এসব জমিতে ধান লাগাইছি। যেটুকু ধান পাবো, তা দিয়ে ঋণ পরিশোধ করবো, না নিজের খাদ্য মেটাব?’

সদর উপজেলার বাদিয়াখালী ইউনিয়নের কৃষক মঞ্জু মিয়ার পাঁচ বিঘা জমিতেও হাঁটুপানি। তিনি মনে করছেন, ফলন অন্তত অর্ধেক কমে যাবে। একই ইউনিয়নের কলিম উদ্দিন শেখ জানান, আলাই নদীর তীরে তার তিন বিঘা জমির ধান নষ্ট হওয়ার পথে।

গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আতিকুল ইসলাম জানান, যেসব জমিতে পানি জমেছে, সেখান থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি বলেন, নতুন করে বৃষ্টি না হলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে না। তবে বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় কৃষকদের অতি দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।