বৈসুর রঙে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও ঐতিহ্যের মহোৎসবে মাতল ত্রিপুরা সম্প্রদায়
পাহাড়ের প্রাণের উৎসব বৈসুকে ঘিরে খাগড়াছড়িতে নেমেছে বর্ণিল আনন্দের ঢেউ। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর সম্প্রীতির অপূর্ব মেলবন্ধনে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ মেতে উঠেছেন বৈসুর উচ্ছ্বাসে। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, দৃষ্টিনন্দন ডিসপ্লে প্রদর্শনী এবং মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক আয়োজনের মধ্য দিয়ে যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে পাহাড়ের শতবর্ষের ঐতিহ্য।
বৃহস্পতিবার (০৯ এপ্রিল) সকালে জেলা শহরের পৌর টাউন হল প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয় এ আয়োজন। বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদ ও বাংলাদেশ ত্রিপুরা যুব কল্যাণ সংসদের উদ্যোগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন নানা বয়সি মানুষ—শিশু, তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে প্রবীণরাও। সকলের পরনে ছিল ত্রিপুরাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক, যা পুরো আয়োজনকে করে তোলে আরও বর্ণাঢ্য ও দৃষ্টিনন্দন।
এদিন ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বয়সি নারী, পুরুষ ও তরুণ-তরুণীরা নিজ নিজ ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও গহনা পরে শোভাযাত্রায় অংশ নেন, যা পুরো আয়োজনকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে এবং দর্শনার্থীদের মনে মুগ্ধতা ছড়িয়েছে বহুগুণে।
বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি কমল বিকাশ ত্রিপুরার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা। তিনি বলেন, ‘বৈসু শুধু একটি উৎসব নয়, এটি আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। এ উৎসবের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে।’
অনুষ্ঠানের শুরুতেই ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী গরিয়া নৃত্য ও বৈসু নৃত্য পরিবেশন করা হয়, যা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। ঢোলের তালে তালে নৃত্যের ছন্দ আর রঙিন পোশাকের বাহার পুরো পরিবেশকে করে তোলে উৎসবমুখর। পাশাপাশি ছিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, লোকগান ও ঐতিহ্যবাহী ডিসপ্লে, যেখানে ফুটে ওঠে ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, কৃষি সংস্কৃতি ও আচার-অনুষ্ঠানের চিত্র।
এরপর শুরু হয় বর্ণাঢ্য বৈসু শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি পৌর টাউন হল প্রাঙ্গণ থেকে বের হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে চেঙ্গী স্কয়ার ঘুরে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ মাঠে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল রঙিন ব্যানার, ফেস্টুন ও বৈসুর প্রতীকী উপকরণ, যা পথচারীদের দৃষ্টি কাড়ে এবং উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে দেয় সর্বত্র।
উৎসবকে ঘিরে শহরের পাশাপাশি পাহাড়ে, গ্রামে গ্রামে ও প্রত্যেক ঘরে ঘরে বিরাজ করছে আনন্দঘন পরিবেশ। হাসি, আনন্দ আর ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় মুখর হয়ে উঠেছে পুরো জনপদ। স্থানীয়দের পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও এ আয়োজনে অংশ নিয়ে সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম এন আবছার, খাগড়াছড়ি প্রেসক্লাবের সভাপতি তরুণ কুমার ভট্টাচার্য্য, সাধারণ সম্পাদক এইচ এম প্রফুল্ল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদ সাকিব, বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শুভ্রদেব ত্রিপুরা সাইমন, জেলা পরিষদের সদস্য ধনেশ্বর ত্রিপুরা, জয়া ত্রিপুরা, প্রশান্ত ত্রিপুরা এবং বাংলাদেশ ত্রিপুরা যুব কল্যাণ সংসদের সভাপতি নবলেশ্বর ত্রিপুরা লায়নসহ ত্রিপুরা সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
বৈসু উৎসব মূলত পুরাতন বছরের গ্লানি মুছে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর এক অনন্য আয়োজন। প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে জীবনকে নতুনভাবে সাজানোর আহ্বান জানায় এই উৎসব।
খাগড়াছড়ির এ আয়োজন যেন আবারও প্রমাণ করে—পাহাড়ে উৎসব মানেই শুধু আনন্দ নয়, এটি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর সহাবস্থানের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।