দিনের আলোতে ক্ষতচিহ্ন স্পষ্ট, সরিয়ে রাখা হয় খননযন্ত্র
ভোরের আলো ফুটতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ক্ষতবিক্ষত কৃষিজমি। কোথাও গভীর গর্ত, কোথাও নতুন তৈরি পুকুর, আবার কোথাও উঁচু করে ফেলা মাটির স্তূপ। অথচ আশপাশে নেই কোনো খননযন্ত্রের উপস্থিতি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রশাসনের নজর এড়াতে ব্যবহৃত এক্সকাভেটরগুলো মূল খননস্থল থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, রাত নামলেই আবার শুরু হয় মাটি কাটার কার্যক্রম।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এভাবেই রাতের আঁধারে কৃষিজমির উপরিভাগ (টপসয়েল) কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠছে দীর্ঘদিন ধরে। গত রোববার দুপুরে সরেজমিনে উপজেলার হাইলধর ইউনিয়নের কুনিরবিল ও পরৈকোড়া ইউনিয়নের ওষখাইন, মামুরখাইন, তাঁতুয়া ও শিলালিয়া এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ কৃষিজমির উপরিভাগ কেটে নিচু করে ফেলা হয়েছে। কোথাও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও খননের মাধ্যমে পুকুর তৈরি করা হয়েছে। এতে জমিগুলো চাষাবাদের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মূলত রাতের বেলায় ট্রাক ও খননযন্ত্র ব্যবহার করে মাটি কাটা হয়। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত চলে এ কার্যক্রম। সকাল হওয়ার আগেই কাটা মাটি ট্রাকে করে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়। এসব মাটি আশপাশের বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে জায়গা ভরাট ও ইটভাটায় ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত তিন ব্যক্তির নাম উঠে আসে। তারা হলেন আব্দুর রহিম, মো. সাদ্দাম, পরৈকোড়া ইউপি সদস্য আব্দুস শুক্কুরের ছোট ভাই আব্দুল মান্নান। স্থানীয়দের দাবি, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজামের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
এদিকে নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম মাসিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অবৈধভাবে মাটিকাটা এবং অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে জিরো গ্রহণ করা হয়েছে।
কুনিরবিল এলাকার এক কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘রাতে ফসলি জমির মাটি কেটে পাশের মুবিন নামের এক ব্যক্তির বসতভিটার জায়গা ভরাট করা হচ্ছে। এ ছাড়া এখানকার মাটি ট্রাকে করে বিভিন্ন জায়গায় সরবরাহ করছে একটি চক্র। সকালে এসে দেখি জমির বড় অংশ কেটে নিয়ে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে কৃষিজমি আর থাকবে না।’
কৃষকের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে মোমিন নামের ওই ব্যক্তির বাড়ির আঙিনায় গিয়ে দেখা যায়, মাটি কেটে এনে বসতঘরের পাশের অংশে ভরাট করে জমি ১০ থেকে ১৫ ফুট উঁচু করা হয়েছে। সেখানে বড় আকারের মাটির স্তূপ দেখা যায়। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে মোমিনকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি। তার স্বজনেরা দাবি করেন, নিজেদের জমি থেকেই মাটি এনে ভরাট করা হচ্ছে।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মো. ইউসুফ আলী বলেন, দিনের বেলায় প্রশাসনের নজরদারি এড়ানোর জন্য খননযন্ত্রগুলো ঘটনাস্থল থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কোনো কাজই হচ্ছে না। কিন্তু রাত ১১টার পর থেকেই শুরু হয় তাদের আসল কর্মযজ্ঞ। তখন একের পর এক ট্রাক আসে, মাটি কাটা চলে গভীর রাত পর্যন্ত।
হাইলধর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মোজাহের মিয়া বলেন, ‘মাটি কাটার বিষয়ে কিছু কথা শুনেছি। তবে যাদের নাম বলা হচ্ছে তারা সরকারি দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। আমার ওয়ার্ডের ভেতরে সরাসরি এমন কার্যক্রম চোখে পড়েনি, তাই বিস্তারিত বলতে পারছি না।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মাটিখেকোদের মূলহোতা হিসেবে পরিচিত অভিযুক্ত আব্দুল মান্নানের সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
অন্য অভিযুক্ত মো. সাদ্দাম হোসেন পুরো বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘মাটি কাটার সঙ্গে আমি কোনোভাবেই জড়িত নই।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামীম আহমদ সরকার বলেন, ‘কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি কাটা সম্পূর্ণ বেআইনি। জমির ওপরের অংশেই মূল উর্বরতা থাকে। মৌসুমে প্রয়োগ করা সারের বড় অংশ মাটিতে থেকে যায় এবং পরবর্তী মৌসুমে তা ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে। কিন্তু এই মাটি কেটে নেওয়া হলে কৃষকদের আবার নতুন করে সার কিনে ব্যবহার করতে হয়, ফলে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং ফলন কমে।’
তিনি আরও বলেন, এভাবে চলতে থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিনা আক্তার দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘অবৈধ মাটি কাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গতকালও একটি এক্সকাভেটর জব্দ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কৃষক বা জমির মালিকের কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পাইনি। এখন থেকে জমির মালিকদের বিরুদ্ধেও আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’