২৯ মার্চ ২০২৬, ১৭:৩৯

অর্ধলাখ মানুষ কর্মহীন, বন্দর-করিডর দ্রুত চালুর দাবি

টেকনাফ স্থলবন্দর ও শাহপরীর দ্বীপ করিডর  © সংগৃহীত

টেকনাফ স্থলবন্দর ও শাহপরীর দ্বীপ করিডর দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় থমকে গেছে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত বাণিজ্য। মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধ ও সীমান্তে অশান্ত পরিস্থিতির কারণে স্থলবন্দর ১১ মাস ধরে বন্ধ। তারও চার বছর আগে থেকে শাহপরীর দ্বীপ করিডর বন্ধ। এতে সরকার বছরে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি মিয়ানমার থেকে পণ্যে আমদানি লক্ষ্যে বাংলাদেশ থেকে পাঠানো প্রায় ৯৩ লাখ ডলার আটকা রয়েছে সে দেশে।

স্থানীয়রা বলছেন, বন্দর ও করিডর ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যবসায়ী, শ্রমিক, কর্মচারী ও পরিবহন খাতের প্রায় অর্ধলাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। জীবিকার সংকটে পড়া অনেকে এখন বিকল্প রোজগারের সন্ধানে ছুটছেন, যা সীমান্ত এলাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। তবে সম্প্রতি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ টেকনাফ স্থলবন্দর চালু করার বিষয়ে আশার কথা শোনান। তিনি বলেন, স্থলবন্দরটি চালুর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কক্সবাজার-৪ আসনের (উখিয়া-টেকনাফ) সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকার মানুষের প্রধান কর্মস্থল টেকনাফ স্থলবন্দর ও শাহপরীর দ্বীপ করিডর বন্ধ রয়েছে। এতে লাখো মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। রাজস্ব হারানোর পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে জড়িত স্থানীয় বহু ব্যবসায়ী ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

সরেজমিন দেখা যায়, শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দূরে সদর ইউনিয়নের কেরুনতলী এলাকায় নাফ নদীর তীরে স্থলবন্দর এখন জনশূন্য। পণ্য খালাস নেই, নেই শ্রমিক বা ব্যবসায়ীদের আনাগোনা। একসময় যেখানে শত শত ট্রাক ও সারি সারি কার্গো বোট পণ্য নিয়ে ভিড়ত, সেখানে এখন তালাবদ্ধ গুদামঘর আর ফাঁকা ঘাট। একই অবস্থা টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ করিডরেও। শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে সাবরাং ইউনিয়নের নাফ নদীর তীরে অবস্থিত এই করিডর একসময় মিয়ানমার থেকে গরু ও মহিষ আমদানির অন্যতম কেন্দ্র ছিল। বর্তমানে জেটি ও বাঁধসংলগ্ন পুরো এলাকা ফাঁকা পড়ে আছে।

নাফ নদীর জেটিঘাটে বসে কথা হয় মোহাম্মদ কাশেমের সঙ্গে। প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি মিয়ানমার থেকে আসা পশুবাহী ট্রলার খালাসের কাজ করতেন। তিনি বলেন, ‘চার বছর ধরে মিয়ানমার থেকে গবাদিপশু আসা বন্ধ থাকায় আমার আয়ের পথও বন্ধ হয়ে গেছে। আগে করিডরে কাজ করে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হতো, এখন কাজ না থাকায় পরিবার নিয়ে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে।’ 

প্রায় দেড় বছর ধরে চলমান যুদ্ধে মিয়ানমারের রাখাইন
রাজ্যের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। নাফ নদীর মিয়ানমার অংশে নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। গত বছরের এপ্রিলে কমিশন (চাঁদা) না পাওয়াকে কেন্দ্র করে আরাকান আর্মির বাধার মুখে মিয়ানমারের জান্তা সরকার সীমান্ত বাণিজ্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। স্থলবন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘গত বছরের এপ্রিল থেকে সীমান্ত বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ থাকায় আমাদের মাসে ৩০ লাখ টাকা করে প্রায় তিন কোটির বেশি টাকা লোকসান হয়েছে। এই সময় আমরা ১৫ কোটি টাকার আয় থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’

কাস্টমস ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে মিয়ানমার থেকে এসেছে ১ লাখ ৯৯ হাজার ২২৫ টন পণ্য, রাজস্ব আদায় হয় ৪০৪ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি হয় ৭৮ হাজার ৫২৭ টন, রাজস্ব আসে ৬৪০ কোটি টাকা, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হয় মাত্র ১৫ হাজার ৭৫৭ টন, রাজস্ব আসে ১০৮ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ স্থলবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তা মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘বন্দর চালু করতে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ঈদের পর মিয়ানমার থেকে পণ্যে আসার সম্ভবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে আমাদেরও সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। আমদানিকারকরাও সক্রিয় হচ্ছেন।’

বন্দরের শ্রমিক নেতা মোহাম্মদ করিম বলেন, ‘বন্দর বন্ধ থাকায় আমাদের কষ্টের দিন কাটছে। ১১ মাস ধরে হাজারো শ্রমিকের দুর্দিন যাচ্ছে। এই বন্দরের উপর অন্তত ১০ হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল ছিল। বন্দর চালু কথা শুনে সবাই খুশি।’

টেকনাফ স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি ওমর ফারুক (সিআইপি) বলেন, সরকার বন্দর চালুর বিষয়ে আন্তরিক। আমরা আশাবাদী খুব শিগগির টেকনাফ সীমান্ত বাণিজ্য আবার চালু হবে। এতে একদিকে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে আমদানি-রপ্তানির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরাও লোকসান থেকে কিছুটা মুক্তি পাবেন।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী বলেন, টেকনাফ স্থলবন্দর চালুর উদ্যোগ অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার কারণে বন্দরের অনেক অবকাঠামো নষ্ট হয়ে গেছে, সেগুলো সংস্কারের উদ্যোগও নিতে হবে। এখন প্রথম করণীয় হওয়া উচিত কয়েক বছর আগে ইস্যু করা ব্যাংক ড্রাফটের বিপরীতে মিয়ানমারে আটকে থাকা পণ্যগুলো নিরাপদে দেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা।